৪ মার্চ ২০২৬

শ্বাপদসংকুল অরণ্য হয়ে রাঙ্গুনিয়ায় ইয়াবা প্রবেশ

আশিক এলাহী, রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি »

মাদক-ইয়াবা নিয়ন্ত্রণে সরকার জিরো টলারেন্স। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এসব চোরাচালান বন্ধে বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার, মামলা-হামলা সংঘঠিত হয়েছে। তবুও বন্ধ হয়নি চোরাচালান।

রাঙ্গামাটির সীমান্তসংলগ্ন কাউখালি উপজেলা দিয়ে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা মালিরহাট হয়ে অবাধে আসছে ইয়াবা, হেরোইন, ড্রাইজিন, পাহাড়ি মদসহ বিভিন্ন মরণনেশা দ্রব্য। ‘ইয়াবা আরএক্স-৪’ পৌছে যাচ্ছে সহজে মাদকসেবীদের হাতে। রাঙ্গামাটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে দিনরাত প্রতিদিন কোটি টাকার চোরাচালান পাচারের অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে আসছে বলে জানা গেছে। রাঙ্গামাটির সীমান্তবর্তী রাঙ্গুনিয়ার রাজারহাট ও কাপ্তাই চন্দ্রঘোনা ১ নম্বর ইউনিয়নের খ্রিষ্টান পল্লী ৯ নম্বর ওয়ার্ড, কলাবাগান, বারোগুনিয়া এলাকা হয়ে অবৈধভাবে ইয়াবাসহ আসছে মরণজনিত বিভিন্ন মাদকদ্রব্য।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানে শহরে কিছুটা লাগাম আসলেও লাগামহীন অবস্থা গ্রামে। গ্রামে এখন অল্প দিনে কোটির টাকার ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইয়াবা ব্যবসা। সহজে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্নে ইয়াবা ব্যবসায় ঝুঁকে পড়ছে যুবক থেকে বয়স্করাও। গ্রামাঞ্চলে ইয়াবা এখন মহামারি রুপ ধারণ করেছে। প্রায় প্রতিটি গ্রামের আনাচেকানাচে ইয়াবা বাণিজ্য বিস্তার ঘটেছে। যুব সমাজ জড়িয়ে পড়ছে মরণনেশা মাদকের নেশায়। স্থানীয় প্রভাবশালীদের একটি অংশ এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। মাদকদ্রব্য বিকিকিনি বাণিজ্যে ও আসক্তিতে পারিবারিক কলহ, সাংসারিক জীবনের বিচ্ছেদ অহরহ। এতে সেবনকারীরা উত্তোজিত হয়ে সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট, ধর্ষণ ও খুনাখুনির ঘটনাও ঘটছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশের পাশবর্তী দেশ মিয়ানমার ইয়াবা সাম্রাজ্য হওয়ায় সরকার থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে আছে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকা কক্সবাজার ও বান্দরবন। তবে বর্তমানে মিয়ানমার থেকে রাঙ্গামাটি হয়ে রাঙ্গুনিয়ার রাজারহাট, পোমরা মালিরহাট ও চন্দ্রঘোনার খ্রিষ্টান পল্লী, বারোগুনিয়া, কলাবাগান সীমান্ত দিয়েও অবাধে ঢুকছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন জাতের মাদকদ্রব্য। রাঙ্গামাটির পাহাড়ি দুর্গম জনপথে ব্যবসায়ীরা মাদকের ঘাঁটি হিসেবে বেঁচে নিয়েছে এ পথ। মিয়ানমার থেকে বান্দরবন ও রাঙ্গামাটি হয়ে রাঙ্গুনিয়া দিয়ে পাচার হচ্ছে ইয়াবার বড় চালান। রাঙ্গুনিয়াকে ট্রানজিট হিসেবে মাদক কারবারিরা ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।

একজন পাহাড়ি যুবক জানান, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবনের নিরাপদ ট্রানজিট পয়েন্ট চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া। ইয়াবা কারবারিরা রাঙ্গুনিয়ার কর্ণফুলী নদী দিয়ে বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দিচ্ছে ইয়াবার চালান। অদ্ভুত কৌশলে নদী হয়ে বিভিন্ন সড়ক পথ দিয়ে যায় ইয়াবার বিশাল চালান।

স্থানীয়রা বলেন, প্রশাসন মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করার কিছুদিন পর আসামীরা থানা থেকে মুক্তি পেয়ে যায়। আসামীরা আইনের ফাঁকফোঁক দিয়ে বেড়িয়ে পড়ে। এতে ইয়াবা ব্যবসা কমছে না, বরং আরও বাড়ছে।

নাম প্রকাশ না করে একজন মাদক কারবারি বলেন, রাঙ্গুনিয়ায় মাদক ব্যবসায়ীদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। সিন্ডিকেটের অংশ হিসেবে মিয়ানমার থেকে বান্দরবন হয়ে রাঙ্গুনিয়ায় আসছে ইয়াবার চালান। সিন্ডিকেটের অন্য একটি অংশ মিয়ানমার থেকে রাঙ্গামাটি হয়ে রাঙ্গুনিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকার বিভিন্ন প্রবেশপথ দিয়ে অবাধে আসছে বড় চালান। বড় চালান রাঙ্গুনিয়া থেকে যায় শহরের বিভিন্ন স্থানে। বিভিন্ন জাতীয় নেশাদায়ক ট্যাবলেট বিভিন্ন বয়সের লোকের হাতে পৌঁছে যায়।

রাঙ্গামাটির জেলার কাউখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শহিদুল্লাহ বলেন, আমি আসার পূর্বে এখানে অহরহর মাদকদ্রব্য ছিল। গত দুই বছরে অনেক অভিযান চালিয়ে মাদক কারবারি আটক করেছি। এখন ইয়াবা চোরাচালান অনেক কমেছে।

রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন বলেন, পাহাড়ি মদসহ ইয়াবা কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে কাপ্তাই থানা। কিছুদিন পূর্বে কাজলী বেগম নামে একজনকে ইয়াবাসহ গ্রেফতার করে প্রশংসা কুঁড়িয়েছেন, ওসি নাসির উদ্দিন। তাঁর নামে থানায় আগেও একটি মামলা ছিলো বলে জানান তিনি। এছাড়া এ মাসে মো. নাসির উদ্দিন মাদকের বিরুদ্ধে জোরালো ভ্রমিকা রাখায় রাঙ্গামাটির জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হিসেবে ভূষিত হয়েছেন বলে জানান তিনি।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ছৈয়দুল আলম তালুকদার বলেন, পোমরা ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামে মাদকের সর্বোচ্চ বিস্তার ঘটেছে। করোনায় স্কুল-কলেজ বন্ধ হওয়ায় কলেজ পড়ুয়া ছাত্ররা ইয়াবায় জড়িয়ে পড়ছে। মাদকমুক্ত একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ করতে পুলিশ প্রশাসনের সহযোগীতা কামনা করেন, আ’লীগের এই প্রবীণ নেতা।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক ও রাজানগর ইউপি চেয়ারম্যান মো. ইঞ্জিনিয়ার শামসুল আলম তালুকদার বলেন, মাননীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী রাঙ্গুনিয়া পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন, সমাজ বিনষ্টকারীদের আইনের আওতায় আনতে। মাদক কারবারি যে বা যারা হোক তারা সমাজের শত্রু। রাঙ্গুনিয়ায় কোনো মাদক কারবারি থাকতে পারবে না বলে জানান তিনি।

রাঙ্গুনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাহবুব মিলকী বলেন, রাঙ্গুনিয়া থানা মাদক-ইয়াবার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। আমরা অভিযান চালিয়ে প্রতিনিয়তও মাদক কারবারি গ্রেফতার করছি। তবে এখনও যারা আইনের বাইরে আছে, তাদের কাউকে ছাড় দিব না।


চট্টগ্রাম মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হুমায়ুন কবির খন্দকার বলেন, বান্দরবন-রাঙ্গামাটি পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে বেশ মাদকদ্রব্য ও পাহাড়ি মদসহ জব্দ করে একাধিক কারবারি গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি। শহরে মাদকের প্রবল চাহিদা থাকায় গোপনে রাঙ্গুনিয়ার নদী ও সড়ক পথে যাচ্ছে ইয়াবা চালান। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে দাবী করে এ কর্মকর্তা আরও বলেন, মাদক নির্মূল করতে চট্টগ্রাম মাদকদ্রব্য অধিদফতর বদ্ধপরিকর।স্থানীয় প্রশাসন নিয়ে অভিযান আরও জোরদার করতে হবে।

প্রশাসন ডালে ডালে চললেও মাদক ব্যবসায়ীরা চলছে পাতায় পাতায়।’ মূলত গডফাদারদের ধরতে না পারার ইয়াবার আগ্রাসন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।’ এমনটাই জানান স্থানীয়রা।

বাংলাধারা/এফএস/এআই

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ