২৭ মার্চ ২০২৬

পাহাড়ী লেক আর বনাঞ্চলের লীলাভূমি রাঙ্গুনিয়া

মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক»

নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের প্রাকৃতিক রাণী চট্টগ্রাম। পর্যটকদের চোখে এ প্রাকৃতিক লীলাভূমি দেখে শেষ করার মতো নয়। একবার দেখে গেলে আবারো চোখ জুড়াতে আসতে হয়। এ যেন শেষ না হওয়া পর্যটন অঞ্চল। কি নেই চট্টগ্রামে? এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর মিলবে না। না দিতে পারবেন পর্যটক, না দিতে পারবেন চট্টগ্রামবাসী। তবে চট্টগ্রামের জিরো পয়েন্ট থেকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যাংছড়ি আর কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন পর্যন্ত যত দূর  চোখ যাবে শেষ যেন নেই প্রকৃতির অফুরন্ত সৌন্দর্য্যরে। এছাড়া রাঙ্গুনিয়া, কাপ্তাই, রাঙ্গামাটি আর খাগড়াছড়ির সাজেক পর্যন্ত কোথাও পর্যটন স্পটের কমতি নেই।

পাহাড়ী লেক আর বনাঞ্চলে ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি রাঙ্গুনিয়া। সেখানে রয়েছে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের ‘বন বাগান’। সাড়ে ১৩শ হেক্টর জুড়ে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক অঞ্চলে পরিণত হওয়া এই ভূমিতে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম লেক। পর্যটকদের আকর্ষণ কাড়তেই এ লেককে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে ফুলবাগান আর জীব বৈচিত্র্যের সমারোহ। এ বনাঞ্চলের প্রকৃতিকে ঘিরে উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ ধরে প্রায় আড়াই কিলোমিটার সড়কও তৈরি হয়েছে পর্যটকদের পথ চলায়।

উঁচুনিচু পায়ে হাঁটা এক সময়কার মেঠো পথ শেখ রাসেল এ্যাভিয়ারি এন্ড ইকো পার্ক হওয়ার কারণে তা ইট সলিং রাস্তায় পরিণত হয়েছে। ফলে দাবড়ে বেড়াচ্ছে পর্যটকরা। দিক-বেদিক হয়ে পর্যটকরা ছুটে চলেছেন দুপুরের খররোদে শেষের ঠিকানা খুঁজতে। বন আর পাহাড় ঘেরা এ বনভূমির সম্মুখভাগে লেক না থাকায় অনেকটা পর্যটক আকর্ষণে ব্যত্যয় ঘটছিল। ফলে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম লেক। কিন্তু পাহাড়ি পথ বেয়ে নিচে নামলেই অনতি দূরে রয়েছে প্রাকৃতিক হ্রদ। শেষ পর্যন্ত এ হ্রদটিও চলে আসবে পর্যটকদের আওতায়। গড়ে তোলা হয়েছে বেশ কয়েকটি পিকনিক স্পট। গোল ঘরের ছাউনীতে গড়ে তোলা এসব স্পটে পর্যটকরা তাদের মনের আনন্দ সারতে ঘন্টার পর ঘন্টা জম্পেস আড্ডাও চালাচ্ছেন।

চট্টগ্রাম শহর থেকে যে কোন বাহনে কাপ্তাই সড়কে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার পাড়ি দিলেই দক্ষিণ বন বিভাগের এই পার্ক। প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকলেই প্রথমে চোখে পড়বে ফুল বাগানের পাশ ধরে বয়ে গেছে কৃত্রিম লেক। সিমেন্টের তৈরি বক্স পাথরে লেকের চারধার আবদ্ধ করা হয়েছে। লেকের মাঝখানে রয়েছে বৃত্তাকার একটি স্পট। যেখানে পর্যটকরা অনাবিল আনন্দে ছবি তোলাসহ সিঁড়ি বেয়ে লেকে নেমে পানি ধরার সুযোগও করা হয়েছে।

লেকের ডানদিক ধরে সামনে গেলেই রোপওয়ের বা ক্যাবলকারের বেইস স্টেশন। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত আবার বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত এ বেইস স্টেশন থেকে ১২টি ক্যাবল কার প্রতিটিতে ৬ জন করে একের পর এক যাত্রা শুরু করে আবার ফিরে আসে। কয়েকটি পাহাড় পেরিয়ে ভূমি থেকে প্রায় ৫শ ফুট উচ্চতায় পথ চলা রোপওয়ে দিয়েই পর্যটকরা অবলোকন করতে পারেন প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য।

প্রায় ৭/৮টি টাওয়ার পেরিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় থাকা শেষ প্রান্তের বেইস স্টেশনে পৌছাতে পারে পর্যটকরা। কিন্তু সুদৃঢ় মনোবল আর সাহসীকতায় পর্যটকরা ক্যাবল কারে পরিভ্রমণ করছেন। তবে শিশুদের আকর্ষণ অনেক বেশি। সৌন্দর্যমন্ডিত এসব ক্যাবল কার চতুরর্দিক থেকে স্বচ্ছতায় ঘেরা। ফলে ক্যাবল কারের ভেতর থেকেই শুধু চারদিক নয়, উর্দ্ধ এবং অধ সবদিকেই অবলোকন করা যায়। প্রথম বেইস স্টেশন থেকে ক্যাবল কার বা রোপওয়ের মাধ্যমে টাওয়ারগুলোতে মৃদু ধাক্কার কারণে কোন কোন পর্যটক কিঞ্চিৎ ভীতির সম্মুখীন হন। বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিলেই বিপত্তি থাকে না মনে। দুয়েকটি টাওয়ার পার হলেই স্বাভাবিকতা চলে আসে পর্যটকদের মাঝে। 

রাঙ্গুনিয়ার হোসেনাবাদ ইউনিয়নের কোদালা বিটের আওতাধীন দক্ষিণ বন বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ২০১৩ সালের ১১ নবেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ইকোপার্কের উদ্বোধন করেন। ওই বছরের ৪ ডিসেম্বর ইকোপার্কের প্রায় ২৫ ভাগ সমাপ্ত সময়ে রোপওয়েতে ১২টি ক্যাবলকারের উদ্বোধন করেন তৎকালীন বনমন্ত্রী তথা বর্তমান তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি। পার্কে জনপ্রতি টিকেট ক্রয়ের মাধ্যমে প্রবেশাধিকার পান পর্যটকরা। প্রাকৃতিক বৈচিত্র ও বনাঞ্চল এমনকি নব উদ্দ্যমে পাখ পাখালির জন্য গড়ে তোলা স্থাপনাসহ পুরো পার্ক বিচরণ করা যায়। কিন্তু ক্যাবলকারে চড়তে হলে প্রাপ্ত বয়স্কদের ও শিশুদের জন্য ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি ক্যাবলকারে ৬ জন পর্যটক প্রায় আড়াই কিলোমিটার পথ ২০ থেকে ২৫ মিনিটে ঘুরে আসতে পারবেন।

ক্যাবলকারের বেইস স্টেশন থেকে শেষ বেইস স্টেশন পর্যন্ত যাওয়া আসা এই ভাড়ায় চলে। পর্যটকরা ইচ্ছে করলে শেষপ্রান্তে থাকা বেইস স্টেশনে নেমে প্রাকৃতিক অবয়ব দেখে পুনরায় অন্য ক্যাবলকারে ফিরে আসতে পারবেন। কিন্তু শেষ প্রান্তের বেইস স্টেশন থেকে কিছুতেই প্রারম্ভিক স্টেশনে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, টিকেট কাউন্টার রয়েছে শুধুমাত্র প্রারম্ভিক বেইস স্টেশনে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৫-০৬ সালে সাড়ে ১৩শ হেক্টর জমিতে গড়ে তোলা হয় বন বাগান। লাখো বৃক্ষরাজির এ বাগানকে অনেকে জঙ্গল দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া বন বাগান বলেও অভিহিত করেন। বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষরাজিতে ভরা এ বাগানে এখন গড়ে তোলা হয়েছে শেখ রাসেল এ্যাভিয়ারি এন্ড ইকো পার্ক।  

বাংলাধারা/এফএস/এফএস

আরও পড়ুন