মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক»
নীলগিরি’র আভিধানিক অর্থ নীল পর্বত। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলছে সুউচ্চ পাহাড়ের সঙ্গে যেন নীল আকাশের মিলনমেলা। কি অসাধারণ দৃশ্য বান্দরবানের পাহাড়ী পথে পথে। তবে অন্তত যারা পর্যটক হয়ে যাচ্ছেন বান্দরবানের নীলগিরিতে তারাই একবাক্যে স্বীকার করছেন বিদেশ কেন, আমাদের মাতৃভূমিতেই রয়েছে চোখে না দেখা অনেক নান্দনিক ও দর্শনীয় স্থান। পর্যটকরা আক্ষেপের সঙ্গে বলেছেন- আমারা পকেটে একটু টাকা হলেই বিলাসীতা দেখাতে বিদেশের মাটিতে পা রাখি আর ফেলে আসি দেশের টাকা। কিন্তু না আমরা একটু সচেতন হলেই দেশের দর্শনীয় স্থানগুলো দেখে সরকারকে উৎসাহিত করতে পারি। সঠিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দেশের মাটিতেই পর্যটন আগ্রহী করে তুলতে।

চট্টগ্রামের তিনটি পার্বত্য জেলাতেই প্রকৃতি আর পাহাড়ের সমারোহ। সমতল থেকে পাহাড়ের চূড়া যেন আকাশ ছুঁয়েছে নীলগিরিতে। বান্দরবান শহর থেকে ৪৭ কিলোমিটার দূরত্বে নীলগিরি। শহরের দক্ষিণ পূর্বে তথা থানচি সড়কেই এই নান্দনিক স্পটের অবস্থান। যেকোন ইঞ্জিন গাড়ীতে নীলগিরি পৌঁছানো গেলেও ঝুঁকি নেয়াটা ঠিক হবেনা নুতনদের জন্য। দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে বান্দরবান শহরে পৌঁছে চাঁদের গাড়ীতে নীলগিরি যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারন নীলগিরির পথচলায় যারা অভিজ্ঞ নয় তারা মাত্র তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায় এসব চাঁদের গাড়ী পাওয়া যায়। আবার জনপ্রতি লোকাল ভাড়ায়ও তথা যাওয়া আসা ৮শ’ টাকায় নলিগিরি ঘুরে আসা সম্ভব। নীলগিরির পথ ধরে চললে পথে পড়বে মেঘলা, শৈলপ্রপাত, চিম্বুক পাহাড়। অন্য সড়কে আরো ২ হাজার ফুট উপরে রয়েছে নীলাচল। এই স্থানটিকে পর্যটকরা বাংলার দার্জিলিং হিসেবে আখ্যায়িত করছেন অবকাশ যাপনের পর।

সমূদ্রপৃষ্ঠ হতে প্রায় ২ হাজার দুইশ ফুট উচ্চতায় নীলগিরি। পাহাড়ের চূড়ায় আর কিছু না থাকায় চারদিকে শুধু মেঘ আর নীল আকাশ। সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমায় মানুষের জন্য অকৃত্রিম ভালবাসা বিলিয়ে দেয়া হয়েছে নীলগিরিতে। সেনাবাহিনীর পরিচালনাধীনে থাকা এই স্পটে প্রবেশে দিতে হয় জনপ্রতি ৫০টাকা আর ৪শ’ টাকায় মাইক্রো পার্কিংসহ সিট ক্যাপাসিটি অনুযায়ী বিভিন্ন অংকের অর্থ গুনতে হয়। নীলগিরির পথে পথে সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট রয়েছে নিরাপত্তার খাতিয়ে। এসব চেকপোস্টে পর্যটকদের আগমন-বর্হিগমনে রেজিষ্টারে পরিচয় লিখে রাখা হয়।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৭ ইঞ্জিনিয়ার কন্সট্রাকশন ব্যাটালিয়ন প্রথমে নীলগিরির চিম্বুক-থানচি সড়কটিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চৌকি নির্মাণ করে। পরে সেনাবাহিনীর উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা এই স্পটকে পর্যটনের আওতায় নিয়ে আসা হয়। বান্দরবানের ম্রো জনগোষ্ঠির কাপ্রু পাড়া এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চেতের স্পটটি শেষ পর্যন্ত নেপাল আর থাইল্যান্ডকে হারা মানিয়েছে। নীলগিরিতে গড়ে তোলা হয়েছে নীলগিরি হিল রিসোর্ট। এসব রিসোর্টের মধ্যে রয়েছে আকাশনীলা, মেঘদূত, নীলাঙ্গনা ও মারমা হাউস নামে বিলাসবহুল কটেজ। তবে রাত্রি যাপনের জন্য সেনাবাহিনীর বান্দরবান ব্রিগেড হেডকোয়াটারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়।

বিলাসবহুল এই কটেজগুলোতে যারা রাত্রি যাপন করেন তারা ভোরের সূর্যোদয় যেমন দেখতে পান তেমনি পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে সন্ধ্যার পর জমে থাকা কুয়াশা মেঘ আকারে সূর্যের আলোয় ভেসে উঠে আকাশে। অনেকটা মেঘ ছুঁয়ে দেখা যায় দিনের শুরুতে। এ ছাড়াও সারদিন নীলগিরির চারিধারে কুয়াশায় ঢাঁকা থাকে শীতকালে। আর বেলা বাড়তে বাড়তে সূর্যের আলোয় দেখা যায় বঙ্গোপসাগরে জাহাজ চলার দৃশ্য। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে সাঙ্গু নদীর এগিয়ে চলাও দেখা যাবে এই গিরি থেকে। এই পর্যটন স্পটে রয়েছে বান্দরবানের মানচিত্র পাথরে সাঁটানো। বান্দরবানের দর্শণীয় স্থান গুলোর মধ্যে রয়েছে স্বর্ণ মন্দির, নীলাচল সমূদ্র পৃষ্ঠ হতে ২ হাজার ফুট উপরে, এর পাশেই রয়েছে সমূদ্র পৃষ্ঠ হতে ২ হাজার ফুট উপরে শুভ্রনীল পাহাড়, ১৫শ’ ফুট উপরে মেঘলা, সাঙ্গু নদী, রাখাইং পুকুর, প্রায় ১৫ একর আয়তনের বগালেক যা সমূদ্র পৃষ্ঠ হতে ১৫শ’ ফুট উপরে উপবন লেক, প্রায় ১০ একর জায়গায় থাকা ক্যামলং জলাশয় পিকনিক ও শুটিংয়ের জন্য বিখ্যাত, প্রান্তিকলেক ২ হাজার ৫শ’ একর এলাকাজুড়ে, চিম্বুক যা সমূদ্র পৃষ্ঠ হতে ১৫শ’ ফুট উপরে, জীবন নগর পাহাড়। লামায় রয়েছে মিরিঞ্চা পর্বত যা সমূদ্র পৃষ্ঠ হতে ১৫শ’ ফুট উপরে , মাতামুহুরী নদী, রোয়াং ছড়ি, নাইক্ষ্যাাংছড়ি, আলীকদম, বলিপাড়া, থানচী, আজিংডং পর্বতমালা যা বর্তমানে বিজয় নামে পরিচিত যা সমূদ্র পৃষ্ঠ হতে ৪ হাজার ৫শ’ ফুট উপরে, কেওক্রাডং পর্বতমালা যা সমূদ্র পৃষ্ঠ হতে ৪ হাজার ৩৩০ ফুট উপরে, আলী সুড়ঙ্গ, ও কানাপাড়া পাহাড়। এছাড়াও জেলা প্রশাসনের পরিচালনায় একটি চিড়িয়াখানা রয়েছে বান্দরবানে। আরো আছে কৃত্রিম হ্রদ, শিশু পার্ক, সাফারী পার্ক, লেকে প্যাডেল বোট, ঝুলন্ত ব্রীজ ও বিভিন্ন পিকনিক স্পট।
বাংলাধারা/এফএস/এফএস












