মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক»
পাহাড় আর লেকের মিলনমেলা নয়নাভিরাম কাপ্তাই। চোখ বুলিয়ে না দেখলেই যেন নয়। কারন অসমাপ্ত থেকে যাবে জীবনের পাতা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি কাপ্তাইতে যেন প্রকৃতির উপহার। পাহাড় আর লেক যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে পর্যটকদের। লীলাভূমির অপরূপ মিলনমেলায় পর্যটকরাও মিশে যাওয়া ছবির পাতায় জায়গা করে নিচ্ছে অন্যতম স্যোশাল মিডিয়া ফেইসবুকে। ফেইসবুকের সাইট থেকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পরিচালিত কাপ্তাই লেকের লেকভিউ ঘিরে গড়ে তোলা ‘লেক ভিউ আইল্যান্ড’। যা প্রতিনিয়ত সাড়া জাগাচ্ছে পর্যটকদের মাঝে।
একদিকে নীল আকাশ, অন্যদিকে কাপ্তাই লেকের পানিতেও যেন নীলের আভা। পর্যটকদের বিমোহিত করে তুলছে নিমিষেই অনাবিল পরিবেশ। ক্ষণিকের স্বপ্নের আবাস জলকৌড়ি, জলকিন্নরী ও নীলকৌড়ি এই বৃহদায়তন নৌকাগুলো যেন লেকের পানিতে ভাসিয়ে পর্যটকদের হাসি আর আনন্দে মাতিয়ে তুলছে। রাজকীয় এসব নৌকায় রাত্রি যাপনে রয়েছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বেস্টনি। এরইমধ্যে পর্যটকরাও আয়োজকদের বার বার ফিরে আসার বাণী শুনিয়ে আগামী দিনের আগমনী বার্তা জানাচ্ছে। ইন্টারনেটের কারণে পুরো পৃথিবী যেন এখন হাতের মুঠোয়। সেনাবাহিনীর এ আয়োজনও যেন হাতের মুঠোয় চলে এসেছে ডিজিটাল যোগাযোগের সর্ববৃহৎ মাধ্যম ফেইসবুকের কল্যাণে। সবকিছুই সম্ভব ফেইসবুকের মাধ্যমে যোগাযোগ থেকে শুরু করে বুকিং পর্যন্ত এমনকি বিভিন্ন দিক নির্দেশনাও দেয়া রয়েছে অতিথিদের নিমিত্তে।

পাহাড়ের কোলঘেঁষে আবার কখনওবা পাহাড়ের চূড়ার উপর দিয়ে বেয়ে চলা সড়ক পথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পরিবহনেই যেতে হবে কাপ্তাই। রাঙ্গুনীয়া ইকো পার্ক পার হওয়ার পর বরইছড়ির উপর দিয়ে সোজা কাপ্তাই। যেখানে রয়েছে দেশের একমাত্র পানি বিদ্যুত কেন্দ্র। যা বর্তমানে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুত কেন্দ্র নামে পরিচিত। সম্পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণে ও বিজিবির প্রহরায় এই পানি বিদ্যুত কেন্দ্রটিতে প্রবেশে রয়েছে নানা নিয়ম কানুন। কোনভাবেই পরিচয় গোপন করে যাওয়ার সুযোগ নেই । পরিপাটি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে গড়া কাপ্তাইয়ের এই স্পটে সুনশান নিরাবতা আর নিরাপত্তা বলেয়ে পর্যটকরা। তবে কাপ্তাই লেকের জেটিগেট এলাকায় ও লেকের বিভিন্ন অংশে জনসাধারণের প্রবেশ থাকলেও স্লুইচগেট এলাকায় প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ স্থানীয়দের। কারণ, যে কোন মুহূর্তে কোন ধরনের আঘটন ঘটলে জবাবদিহিতা দিতে হয় নিরাপত্তা বেষ্টনিতে থাকাদের।
কর্ণফুলী পানি বিদ্যুত কেন্দ্রের গেট পার হলেই নখের পিঠের মত মসৃণ আঁকাবাঁকা সড়ক চলে গেছে লেকের ধারে। অপরূপ দৃশ্য অবলোকন করতে প্রতিনিয়ত জেটিঘাট এলাকায় সর্বসাধারণ জড়ো হলেও লেকের অপরপ্রান্তে থাকা এলাকা সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন । যেখানে রয়েছে সেনাবাহিনীর হেলিপ্যাডও। পাহাড়ের উঁচুতে থাকা এই হেলিপ্যাডে প্রতিনিয়ত জরুরি প্রয়োজনে আসা যাওয়া করছেন সেনাসদস্যরা। এক সময় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনা ছিল লেকের ওপারে থাকা পাহাড়ের চূঁড়া, সমতল আর লেক ঘেঁষে। ২০০৪ সালে এখানে গড়ে তোলা হয়েছিল কর্ণফুলী রিজ্যর্ট। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফখরুদ্দিন হায়দার পিএসসি, রিজিওন কমান্ডার কাপ্তাই এর উদ্যোগে ও পৃষ্টপোষকতায় ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে তৈরি হওয়া এ রিজ্যর্টের আনুষাঙ্গিক কিছু পরিবর্তন এনে তৈরি করা হয়েছে এই নৈসর্গিক স্পট।

এখন সেই স্থাপনায় গড়ে তোলা হয়েছে সিন্ধু সারস রেস্তোরা। রয়েছে হিলটপ কটেজ ও মিনি সুইমিং পুল। অনেকটা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে হবে পাহাড়ের উপর কৃত্রিম সুইমিং পুল যেন তাক লাগিয়ে দিয়েছে। চিত্র শিল্পীদের ক্যামেরার কারিশমায় সুইমিং পুলের পানি আর লেকের লেকের পানি একই ছবিতে ভেসে ওঠা সুবিশাল জলাধার। লেকে থাকা জলকৌড়ি ও জলকিন্নরী নামক ইঞ্জিন নৌকায় চড়ে সোজা চলে যাওয়া যায় লেকভিউ আইল্যান্ডে। সেখানেও রয়েছে নিসর্গ নিলীমায় নামক আরেকটি বিলাসী রেস্তোরা। রয়েছে রাত্রি যাপনের শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত কটেজ। আরও রয়েছে কাঠ, কাঁচ আর রশিতে তৈরি ঝুলন্ত সেতু। গাছের মগডালে কাঠের কটেজ, কিডস জোন, ওয়াটার জেট স্কী, তাঁবু ও বাঁশের তৈরি বাঙ্কার আর জমিয়ে আড্ডা দেয়ার স্থানগুলো যেন আগতদের হাতছানি দিয়ে ডাকে।
পাহাড় আর লেকের মিলনমেলায় গড়ে তোলা হয়েছে পিকনিক স্পট। বন্ধের দিনে ৫০ জনের জন্য স্পট ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিনে তা কিছুটা ডিসকাউন্টে পাওয়া যাবে। এ স্পটকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। আগতরাও বার বার একই স্থানে ফিরে আসার মূলে রয়েছে গøাস হাউস, রেস্টুরেন্ট, মাছ ধরার বিভিন্ন স্পট। ওয়াটার জেট স্কী, ঝুলন্ত ব্রিজ, কিডস কর্ণার, বোট কটেজ, টি হাউস, হাইকিং ও সুইমিং পুল সুবিধা রয়েছে লেকভিউ আইল্যান্ডকে ঘিরে।

দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সময় কাটাতে নির্দিষ্ট ফিতে মাছ ধরার ব্যবস্থাও রয়েছে। হিলটপে রয়েছে শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত জ্যো¯œা চন্দ্রিমা আর অধরা নামের অবকাশ যাপনের সুদৃশ্য ও সুসজ্জিত কটেজ। লেকভিউ আইল্যান্ডে রয়েছে শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত কর্ণফুলী, আর শীতাতাপবিহীন হরিণা ও মাইনি নামের অবকাশ যাপন স্থান। বোট হাউস খ্যাত নীলকৌড়ি যেন নিজের বাড়ির আদলে গড়া সুসজ্জিত বেড রুম লাগানো ড্রয়িং স্পেস। এই বোট হাউস থেকে পূর্ণিমার চাঁদের আলো দেখা যায় লেকে ভাসতে ভাসতে।
চারিদিকে ঝিঁ ঝিঁ পোকা আর শিয়ালের ডাকসহ বিভিন্ন পাখ পাখালির গুঞ্জনে রাত্রি ক্রমশ ভোরের আলোয় পরিণত হয়। সুসজ্জিত আবাস স্থল খ্যাত এই বোটে পর্যটকরা জনপ্রতি ভাড়ায় লেক ভ্রমণ করতে পারবে পর্যটকরা। তবে এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬ জন পর্যটক থাকতে হয়। রাত যাপনে ১৮ ঘন্টার জন্য এই বোট হাউসের নির্ধারিত ভাড়া রয়েছে। ৬ জনের রাত যাপনের ব্যবস্থা আছে এতে। তবে হিলটপ কিংবা অন্যান্য অবকাশ স্থানগুলোতে কম টাকার বিনিময়ে রাত যাপনের সুযোগও রয়েছে। সাত বছরের কমবয়সী শিশুরা এ স্পটে সুবিধা ভোগ করছে শতকরা ৫০ ভাগ ছাড়ে।

এ স্পটে কর্মরত সেনা সদস্যরা ছাড় পাচ্ছেন শতকরা ২৫ ভাগ। এছাড়াও অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যরা পাচ্ছেন ২০ ভাগ ছাড়। রেস্টুরেন্ট লেকভিউ শ্রাবন, ইয়ামি ও সুধায় ফ্যামিলি প্যাকেজ ছাড়াও মেনু অনুযায়ী খাবার পরিবেশনের সুবিধা রয়েছে। কয়েক বছর ধরে চালু হওয়া এই স্পটটি ফেইসবুকে পেইজে লেকভিউ আইল্যান্ড/ কাপ্তাই অথবা কাপ্তাই আইল্যান্ড ২০১৬ এই ঠিকানায় বিস্তারিত তথ্য রয়েছে পর্যটকদের সুবিধার্থে। জি-মেইলে লেকভিউ আইল্যান্ড ডট ২০১৬ এই ঠিকানায় বুকিং দেয়া যায়। তবে এক্ষেত্রে কমপক্ষে ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ ফি জমা দিয়ে বুকিং নিতে হয়।
বাংলাধারা/এফএস/এফএস












