মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক »
পুলিশের অপরাধ দমনে থানা ভিত্তিক সিসি ক্যামেরা স্থাপন হয়েছে ২০২১ ও ২০১৬ সালে ঠিকই, কিন্তু পুলিশের অপরাধ চলছে থানার বাইরে। দালালদের পদচারণা এখন থানার ভেতরে নয়, কৌশলে তা পরিবর্তন করে নেয়া হয়েছে আশপাশের হোটেল বা রেস্তোঁরায়। ফলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কোন পদক্ষেপই কার্যকর হচ্ছে না। অপরাধ দমনে অপরাধীদের থানা ভিত্তিক ডাটাবেস তৈরি করতে গিয়ে তা থমকে গেছে ২০০৯ সালেই।
২০২১ সালে আবার দ্বিতীয় দফায় বিভিন্ন সড়কের মোড়ে মোড়ে ও স্পর্শকাতর এবং অপরাধ প্রবন স্থানগুলোতে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে অপরাধী শনাক্তকরণ ও গ্রেফতারের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কিন্তু কোন সুফল পাওয়া যাচ্ছে না কারন ক্যামেরার ফ্রিকোয়েন্সি পাল্টে দিয়ে থানা ও ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজি চলছে। কন্ট্রেল রুম থেকে ক্যামেরা মনিটরিং করার কথা থাকলেও তা বন্ধ রয়েছে। কিন্তু মুষ্টিমেয় দুয়েকটি ঘটনা ছাড়া অসাধু পুলিশ সদস্যদের চাঁদাবাজী ও অপরাধীদের লাগাম টেনে ধরতে কোন ধরনের পদক্ষেপ নেই সিএমপির।
প্রশ্ন উঠেছে, অপরাধীদের অপরাধ কর্মকান্ড ছাড়াও পুলিশের অপরাধ বন্ধে কোন ধরনের পদক্ষেপই কার্যকর হচ্ছেনা। সড়কের মোড়ে মোড়ে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে অপরাধীদের চিহ্নিত করতে। কিন্তু সিসি ক্যামেরার সামনেই চলছে থানা ও ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজি। এছাড়াও ওয়ানওয়ে সড়কে বিপরীত থেকে গাড়ি চলাচলে পুলিশের অনিয়মও কম নয়। বিশেষ করে ডবলমুরিং থানা পুলিশের দেওয়ানহাট ব্রিজ অতিক্রমের চিত্র নিত্যদিনের।
দেখার কেউ নেই। নাকি পদক্ষেপের নামে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে সিএমপির- এমন প্রশ্ন সচেতন নাগরিকদের। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে সিএমপি কমিশনার মো. ইকবাল বাহার যোগদানের পর ওই বছরের ১৫ মে চট্টগ্রামের মিডিয়া কর্মীদের সামনে ঘোষণা দিয়েছিলেন নানা অনিয়ম বন্ধে বিট পুলিশিং কার্যক্রমের। এমনকি নগরীর ১৬টি থানায় সিসি ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে পুলিশের অপরাধ দমনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে আই ওয়াশের নিমিত্তে। কিন্তু পুরিশের অপরাধ কন্ধ করা যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে চট্টগ্রাম ব্যস্ততম শহর হলেও অনেকটা নিয়মশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে চলছে যানবাহন। তবে পুলিশের অনিয়মের কারণে যানবাহন চালকরাও অনিয়ম শুরু করেছে অর্থের বিনিময়ে। কারণ, যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ণ ব্যবহার দন্ডনীয় অপরাধ হলেও পুলিশের এ বিষয়ে কোন মাথাব্যাথা নেই। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও এ্যাম্বুলেন্স ছাড়া অন্য গাড়িতে হুটার ও বিকন লাইট ব্যবহার করা নিষিদ্ধ হলেও সম্প্রতি রেন্ট এ কার-এর গাড়িতেও ব্যবহার হচ্ছে। ট্রাফিক বিভাগের চরম অব্যবস্থাপনার কারণেই এ ধরনের যানবাহন চলাচল করছে। এতে ফায়দা লুটছে অর্থের বিনিময়ে একশ্রেণীর ট্রাফিক পুলিশ ও থানা পুলিশ।
২০১৬ সালে সিএমপি কমিশনার মো. ই্কবাল বাহার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে বিট পুলিশিং কার্যক্রম শুরু করেন। এমনকি মিডিয়া কর্মীদের জানিয়েছিলেন পুলিশ জনগণের বন্ধু, জনগণ পুলিশের মতই কাজ করবে। পুলিশ ও জনগণের মধ্যে কোন ধরনের দূরত্ব থাকবে না। ফলে কমে যাবে অপরাধ। ডিএমপিতে বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে অপরাধ কমিয়ে আনার অভিজ্ঞতায় চট্টগ্রামের ১৬ থানা এলাকায় ১৪৫ জন এসআইয়ের তত্বাবধানে বিট পুলিশিং কার্যক্রম চালু করা হয়।
সিএমপির সভাকক্ষে ২০১৬ সালের ১৫ মে মিডিয়া কর্মীদের সঙ্গে কমিশনারের বৈঠকে উল্লেখ করা হয়েছিল প্রাইভেট গাড়িতে পুলিশ, সিএমপি, সাংবাদিক, এডভোকেট, চিকিৎসক এমনকি কোন দফতরের নাম উল্লেখ করে কোন ধরনের নামফলক ব্যবহার না করার বিষয়টি। কিন্তু ঠিকই রয়ে গেছে। অথচ, শুধু অন্যান্য দফতরই নয়, স্বয়ং পুলিশের গাড়ি ছাড়াও বিভিন্ন প্রাইভেট গাড়ীতে পুলিশ শব্দটিতে এখনও ব্যবহার হচ্ছে নামফলক। প্রশ্ন উঠেছে, উল্টো পথে গাড়ি যেমন চলছে, রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন ও অন্যান্য যানবাহন চলাচলও বন্ধ হয়নি। বরং পুলিশকে টাকা দিয়েই এ ধরনের অনিয়মে যানবাহন পরিচালনা করছে।
এদিকে, নগরীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্পর্শকাতর জায়গাগুলো ছাড়াও নগরীর মোড়ে মোড়ে এমনকি ব্যস্ততম এলাকাগুলোতে রয়েছে চর্তুমুখী সিসি ক্যামেরা। এসব ক্যামেরায় ধারণ হচ্ছে ফুটেজ। কিন্তু এসব ফুটেজ কোন অপরাধ সংঘটন হওয়ার পর পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অথচ, নিয়মিত ফুটেজ মনিটরিংয়ের কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। অপরদিকে, ২০১৬ সালের ১৫ মে চট্টগ্রামের ১০টি থানাকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। পরে বাকী ৬টি থানাকেও ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে।
এসব ক্যামেরায় পুলিশের অপরাধমূলক ফুটেজ সংরক্ষণ হলেও অপরাধী পুলিশের বিরুদ্ধে সাজামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নজির দেখা যায়নি গত ৫ বছরেও। তবে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে ক্যামেরার বাইরে এমন অভিযোগও উঠছে ১৬টি থানার ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে। এদিকে, বিট পুলিশিংয়ের নামে ১৬টি থানাকে ১৪৫ জন এসআইয়ের তত্ত্বাবধানে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে এ দায়িত্ব কে বা কারা পালন করবেন এমনকি কিভাবে পালন করবেন তা নিয়ে কোন সিদ্ধান্ত দেয়া হয়নি। এ বিষয়ে সিএমপি’র এক কর্মকর্তা বলেন, বিট পুলিশিংয়ে নামে অপরাধের সমঝোতা হচ্ছে পুলিশ ফাঁড়িতে অসাধুদের দ্বারা। সিএমপির প্রত্যেকটি থানায় ছাপনো হয়েছে বিট পুলিশিংয়ে কর্তব্যরত নাম। কিন্তু ১৬ থানায় হাজার হাজার কপি পড়ে রয়েছে বদলীর কারনে। আবার ঘর ভাড়ার নামে বাড়িওয়ালাদের সচেতন করতে নবাগতদের পরিচয় লিপিবদ্ধ করনে যেসব ফরম ছাপানো হয়েছে তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না তৎকালীন কর্মকর্তাদের নাম থাকায়। কারন ওই ফরমে তৎকালীন এসআইদের মোবাইল নাম্বার সংযুক্ত রয়েছে ফলে বিভ্রান্তিতে পড়তে হচ্ছে। ক্যামেরার পর ক্যামেরা লাগানো হচ্ছে। কিন্তু ক্যামেরার মনিটরিং নেই। অপরাধীর চেয়ে এখন পুলিশ সদস্যদের অপরাধই বেশী ক্যামেরার অন্তরালে।
বাংলাধারা/এফএস/এফএস












