২৭ মার্চ ২০২৬

কক্সবাজারে সামুদ্রিক মাছের এ্যাকুরিয়াম

মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক»

সমুদ্রের অতল গর্ভে বাস করে বিচিত্র প্রজাতির মাছ। রয়েছে মানুষ খেকো শৈবালও। কিন্তু ডুবুরী ছাড়া আর কেউ দেখারও সুযোগ নেই সমুদ্রের অতল গর্ভে থাকা জীব বৈচিত্র আর মৎস প্রজাতি। সমুদ্রের বিশালতায় লুকিয়ে রয়েছ নানা অজানা তথ্য। এসব তথ্য বের করে আনতে যুগের পর যুগ পেরিয়ে যাচ্ছে সমুদ্র বিজ্ঞানীদের। আবার কৌতুহলীদের ইচ্ছা থাকলেও দেখার সুযোগ নেই। তবে এ ধরনের একটি সুযোগ করে দিয়েছে কক্সবাজারে রেডিয়েন্ট ফিশ ওয়ার্ল্ড নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

সমুদ্রের তলদেশের নানা জীববৈচিত্র আর মাছের প্রকৃতি দেখার ইচ্ছে থাকলেও আমাদের দেশে উপায় নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের অবস্থান দেখার সুযোগ রয়েছে। তবে আমাদের দেশে সমুদ্রের তলদেশের অবস্থান দেখতে কৃত্রিমভাবে হলেও প্রাকৃতিক অবয়ব সৃষ্টির চেষ্টা করেছে রেডিয়েন্ট ফিশ ওয়ার্ল্ড। কক্সবাজারের ঝাউতলায় এ ধরনের একটি ফিশ এ্যাকুরিয়াম রয়েছে সমুদ্র তলদেশের জীববৈচিত্র আর মাছের প্রকৃতি দেখার সুযোগ নিয়ে।

এ্যাকুরিয়ামে প্রবেশ ফি জনপ্রতি ৩শ টাকা হওয়ায় অনেকেরই নাগালের বাইরে। ইচ্ছে থাকলেও দেখার সুযোগ ও সাধ্য কম জনেরই আছে।  শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য একাডেমিক কারিক্যুলামের ফিল্ড ওয়ার্ক ও ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে। ২০ থেকে ৫০ জনের টিমের জন্য ট্রেইন্ড ট্যুর গাইডের ব্যবস্থাপনায় এ্যাকুরিয়ামটি ভিজিট করা যায়। সমুদ্র বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, আগতদের প্রশ্নোত্তর ও ডকুমেন্টেশন সংগ্রহের ব্যবস্থাও রয়েছে।

কক্সবাজারের ঝাউতলা এলাকায় গড়ে উঠা এই এ্যাকুরিয়ামটি সবচেয়ে বেশি আকর্ষনীয় হয়ে উঠেছে কৌতুহলীদের মাঝে। পর্যটকরা দ্বিতীয় ভবনে থাকা এ এ্যাকুরিয়ামে সংরক্ষিত সামুদ্রিক ও মিঠা পানির মাছের সঙ্গে পরিচিত যেমন হচ্ছে, তেমনি অবাকও হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ দেখে। শুধু তাই নয়, সমুদ্রের তলদেশে থাকা অবয়বে গড়ে তোলা হয়েছে এই এ্যাকুরিয়ামটি। কমপক্ষে ২০ মিলি মিটার পুরুত্বের কাঁচ দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এটি। নিচতলার প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকে দ্বিতীয় তলার ফিশ এ্যাকুরিয়াম শেষ করে ভবনটির তৃতীয় তলা হয়ে বের হতে হয়। তবে আগতদের রিফ্রেশমেন্টের জন্য ভবনের  তৃতীয় তলায় রয়েছে খাবারের দোকান, সামুদ্রিক শামুক, ঝিনুক, কৌড়িসহ বিভিন্ন প্রাণির খোলসের ওপর গড়ে তোলা শোপিচের দোকান।

টিকেট নিয়ে এ্যাকুরিয়ামের নিচতলায় থাকা প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকলেই ফটোসেশন এরিয়া পাওয়া যাবে। এরপর ওয়াটার ফল জোনে দেখা যাবে ভয়ংকর মানুষখেকো পিরানহা মাছ। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার পরিচিতি পড়তে পড়তে সামনে পড়বে মাছের সঙ্গে খেলা করার সুযোগ। এ অংশতে সামান্য পরিমাণ খাবার দিলেই ধেয়ে আসে বিচিত্র রকমের মাছ। রিভারস্ট্রীম ভিউতে গেলে দেখা যাবে রঙিন তেলাপিয়া ও থাই পাঙ্গাস মাছ। ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট্রের অভয়বে গড়ে তোলা জোনে রয়েছে ক্রোকোডাইল, রয়েল বেঙ্গল টাইগার আর হরিণ। এ্যাকুরিয়ামের বিভিন্ন বক্সে আলাদা আলাদা রয়েছে স্বাদু পানির ও নোনা পানির মাছ। 

সাগর তলের রহস্য জানতে বিশ্বমানের এই সী এ্যাকুরিয়ামে স্পেশাল প্যাকেজ রয়েছে জনপ্রতি ৬৫০ টাকায়। এ প্যাকেজে এ্যাকুরিয়ামে প্রবেশ ফি, ফিশ ফিডিং, ট্রেডি মুভি, আট/বার সাইজের এককপি ছবি তোলার সুযোগ, বাচ্চাদের জন্য দুটি রাইডস, ১০ শতাংশ ডিসকাউন্টে সুভিন্যুর সপে সামুদ্রিক শোপিচসহ বিভিন্ন পণ্য কেনার সুযোগ ছাড়াও দুটি মেন্যুতে দুপুরের বা রাতের খাবার। একটি মেন্যু বাংলা খাবার হলেও আরেকটি মেন্যু চাইনিজ খাবারের সেট মেন্যু।

কোনো ক্লাব, সংস্থা, কোন কোম্পানি, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপক্ষে ২০ থেকে ৫০ জনের জন্য ট্রেইন্ড ট্যুর গাইডের ব্যবস্থাপনায় এ্যাকুরিয়াম ভিজিট করা যায়। সে সঙ্গে সংগ্রহ করা সম্ভব সমুদ্র বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, প্রশ্নোত্তর ও ডকুমেন্টেশন। মুভি আওয়ারের সঙ্গে কুইজ কম্পিটিশন ও বিশেষ পুরস্কারের ব্যবস্থা রেখেছে কর্তৃপক্ষ।

শিক্ষার্থী, গবেষক ও পর্যটকদের জন্য সমুদ্রের তলদেশ তথা পানির অতল গহ্বরে থাকা জীববৈচিত্র ও বিভিন্ন প্রজাতির মাছসহ সামুদ্রিক পানির সঙ্গে পরিচয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে এ আঙ্গিনায়। সমুদ্র বিজ্ঞানীদের দ্বারা শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর হাতে কলমে পাঠদানের ব্যবস্থা রয়েছে। রেডিয়েন্ট ফিস ওয়ার্ল্ডের নিজস্ব রিসার্চ ভেসেলে অন বোর্ড  ইনস্ট্রুমেন্ট হ্যান্ডলিং অ্যান্ড অপারেশন সম্পর্কে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থাও করা হয়ে থাকে ইচ্ছুকদের জন্য। সমুদ্রের টার্গেটকৃত স্থানে ও গভীরতায় স্যাম্পলিং এর সুব্যবস্থাও করা হয় পর্যটকদের জন্য।

সমুদ্রে রোমাঞ্চকর দৃশ্য অবলোকনের প্যাকেজ তথা মিটিং উইথ ফ্লায়িং ফিস, গভীর সমুদ্রে ডলফিনের সঙ্গে মেতে উঠার দুর্লভ সুযোগ, অতল সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড জয় করার মত অদম্য উচ্ছ¡াসের ব্যবস্থা, অপার সৌন্দর্যের নীল সমুদ্র অবলোকন, প্রবালের সন্ধানে সেন্টমার্টিন দ্বীপে অভিযান অর্থাৎ কোরাল আইল্যান্ডে অবস্থান নেয়ার মত আনন্দঘন প্যাকেজ রয়েছে এই এ্যাকুরিয়াম কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায়।

সমুদ্রের উপরিভাগ তথা ঢেউ থেকে তলদেশে থাকা মাটি পর্যন্ত মোট ১৪টি স্তর রয়েছে। এ স্তরগুলোতে জলজ প্রাণি যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে উদ্ভিদও। রয়েছে পাথর আর শিলার নানা স্তর। জলজ প্রাণি মাছ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের কেউটেও রয়েছে। সমুদ্রের অতল গহŸরে থাকা ১৪টি স্তরের প্রাণিদের নিয়ে সমুদ্র বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে যাচ্ছেন।

এমন অনেক ধরনের মাছ উঠে আসছে জেলেদের জালে অথবা গবেষণাকালীন সময়ে যা এ্যাকুরিয়ামের বক্সে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। পরিচিতি তুলে ধরা হয়নি এমন অনেক মাছ ও সামুদ্রিক জীব রয়েছে এ্যাকুরিয়ামে। দ্বিতীয় তলা অনেকটা মনে হয় যেন সমুদ্রের পানির ভেতর দিয়ে দর্শনার্থীরা পার হয়ে যাচ্ছে। কারণ, মেঝে ছাড়া ডানে, বায়ে ও ওপরে তিন দিকেই পানি। মোটা কাঁচের আস্তর ধরে রাখা হয়েছে এসব প্রাণি এ্যাকুরিয়ামে থাকা মাছের জন্য। মাথার ওপর দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে বড় বড় কোরাল, শৌলসহ নানা প্রজাতির মাছ। বিদঘুটে দেখতে পাথরের টুকরোর মত মাছও রয়েছে এ্যাকুরিয়ামের ভেতর।

এ্যাকুরিয়ামে সমুদ্রের অতল গর্ভের মাছ যেমন রয়েছে তেমনি মিঠা পানির মাছও রাখা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে সিলভার চাঁন্দা, কালো চাঁন্দা, টিন চাঁন্দা, জেলি ফিস যা কক্সবাজারের মানুষরা স্থানীয় ভাষায় নুইন্ন্যা মাছ বলে থাকে। বিদখুটে ধরনের মাছও দেখা যায়, যাকে বলা হয় স্টোন ফিশ। কারণ, এটা দেখতে অনেকটা পাথর রঙের। সামুদ্রিক ঘোড়া, ট্যাংরা, সিলভার অ্যারোনা, থ্রি স্পট, টিটরা মাছ, অসকার মাছ, টাইগার ডোরাকাটা, ব্ল্যাক প্যারোট, ব্ল্যাক মলি, স্পটেট গার, টাইরা বাটফিস, রাজ কাঁকড়া, কিচিং গোরামি, লবস্টার, বাগদা, দাতিনা কোরাল, বাইলা, পাইপ ফিস, কামিলা ফিস, পনি ফিস, হোয়াইট স্ন্যাপার, রেড স্ন্যাপার।

আর্কার ফিস, বাটার ফ্লাই, প্যারাসিড ফিস, সন্ন্যাসি কাকড়া, চাকা শামুক, থ্রি স্পট কাকড়া, লজ্জাবতী কাকড়া, নীল সাঁতারু কাকড়া বা ব্লু সুইমিং, চেরিবিটস কাকড়া, মাড কাকড়া, মেন্টিস শ্রিম্প, পাপার ফিস, হোয়াইট স্পট ব্যাম্বো ফিস, গোল্ড ফিস, ইন্ডিয়ান ফ্ল্যাপস সিল, সাধু পানির কচ্ছপ, চাকার ফিস, বটিয়া মাছ, রেড গোস্ট, সাথাইট্যা, আমেরিকান ইল, মোরে ইল, বারগুনি, কোরাল, ভোলপোয়া, লইট্যা, ছুরি, আটলান্ট্রিক সার্জেন্ট মেজর, কামিলা, নাইপ ফিস, এঞ্জেল ফিস, মহাশোল, চিতল, ব্ল্যাক পিরানহা, মেকং জায়ান্ট ক্যাট ফিস।

বাংলাধারা/এফএস/এফএস

আরও পড়ুন