২৬ মার্চ ২০২৬

হোঁচট খাচ্ছে পতেঙ্গা পর্যটন

মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক»

চট্টগ্রামে সিটি আউটার রিং রোডের নেপথ্যে ছিল সমূদ্র সৈকত নগরীর পতেঙ্গাকে  বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে তৈরী করা। এ পর্যটন কেন্দ্র তৈরী করতে গিয়ে নগরীর সমূদ্র উপকূলীয় এলাকা রক্ষায় প্রায় ৩০ ফুট উচ্চতা সম্পন্ন রিং রোড বা আউটার সার্কুলার রোড তৈরী করা হয়েছে। এই সড়ক একদিকে যেমন বেড়ীবাঁধ হিসেবে কাজ করবে অন্যদিকে প্রায় ৮৪ ফুট প্রশস্থ এই সড়কের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে বঙ্গবন্ধু টানেলের মাধ্যমে কক্সবাজার যাবে পর্যটকরা।

কিন্তু হোঁচট খেল পাঁচ কিলোমিটার ব্যাপী বিশ্বমানের এই পর্যটন কেন্দ্র। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের(চউক) পরিচালনায় থাকার কথা থাকলেও কাজবন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ২০১৯ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও শেষ হয়নি আদৌ। তবে পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত প্রায় ১৭ কিলিামিটার চিটাগাং আউটার রিং রোড প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। বাদ পড়েছে বাকি সব উন্নয়ন। উল্ল্যেখ,এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে ২০১১ সালে।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যদিও চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্পের আওতায় পতেঙ্গাকে বিশ্বমানের পর্যটন করার পরিকল্পনা একনেকে অনুমোদন নিয়ে তা থেকে পিছিয়ে গেছে। চউক চেয়ারম্যানের আবদুচ ছালামের পরিবর্তনের পর চউকের উন্নয়ন থেমে গেছে। সমুদ্র সৈকতে পাঁচ কি.মি এলাকা জুড়ে সৌন্দর্যবর্ধন কাজ শুরু করার কথা থাকলেও তা আর হচ্ছে না। সৌন্দর্য বর্ধন কাজটিকে জোন -১ এবং জোন-২ দুটি অঞ্চলে বিভক্ত করে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়েছিল ঠিকই কিন্তু সে উন্নয়ন ভেস্তে গেছে। ২০১৯ সালের ফেব্রæয়ারীতে পতেঙ্গার কিছু অংশ নান্দনিক রূপ দেওয়া হলেও এখন তা ঝোপ জঙ্গলে পরিণত হয়েছে।

আরো অভিযোগ রয়েছে, জোন-১ এর সৌন্দর্যবর্ধন কাজের আওতায় সমুদ্র তীর সংলগ্ন ৫ কি.মি দীর্ঘ ওয়াক ওয়ে, বয়স্ক ও শিশুদের জন্য বিনোদন কেন্দ্র এবং কিড্স জোন, বিভিন্ন ধরণের মেকানিক্যাল ও নন-মেকানিক্যাল রাইড এর ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা থাকলেও তা থেমে গেছে পতেঙ্গায়। এছাড়া সবুজায়নের উদ্দেশ্যে সুসজ্জিত বাগান এবং সমুদ্র সৈকতের পাঁচ কিলোমিটার এলাকার সৌন্দর্য উপভোগের জন্য ক্যাবল কার এর সংস্থান যেন স্বপ্নেই রয়ে গেল চট্টগ্রামবাসীর কাছে। সমুদ্রের বালিয়াড়ীতে  নামার জন্য সিঁড়ি এবং বোটিং এর জন্য জেটির সংস্থান থাকার কথা থাকলেও তা বাস্তবতা পাবেনা।

এছাড়া রাত্রিকালে পতেঙ্গাঁ সমূদ্র সৈকতের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য লাইটিং এর মাধ্যমে কিছু অংশ পর্যাপ্ত আলোকসজ্জ্বার ব্যবস্থা করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু আসনগুলোর আশ পাশ ঝোপ জঙ্গলে ভরে গেছে। প্রকল্প এলাকায় ১০০০ গাড়ী পার্কিং করার কথা থাকলেও তা আর হচ্ছে না। জোন-২ অঞ্চলে বিশদ পরিসরে সৌন্দর্যবর্ধন, হোটেল-মোটেল, আধুনিক মান সম্পন্ন প্লাজা, সুসজ্জিত বাগান এবং টয়ট্রেন  থাকার কথা থাকলেও তা চলে যাচ্ছে হিমঘরে। কারন আবারো ভ্যানগাড়ী আর টুকরী নিয়ে বিভিন্ন পসরা সাজিয়েছে ব্যবসায়ীরা। সর্বোপরি দুইটি জোনে লক্ষ লক্ষ পর্যটকের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধাদি সৃষ্টি  করার লক্ষ্য থেকে সরে গেছে চউক।

চউকের পক্ষ থেকে জানা গেছে, ২০০৬ সালে জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) চট্টগ্রাম শহরের অপ্রতুল অবকাঠামোগত অসুবিধা চিহ্নিতকরণে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে। ওই সমীক্ষায় ট্রাংক রোড নেটওয়ার্কের আওতায় দুটি রিং রোড ও ৬টি রেডিয়াল রোড নির্মাণের প্রস্তাব করে জেবিআইসি। এ প্রস্তাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম সিটি রিং রোডটি নির্মানের গুরুত্ব দেয়া হয়।  চউকের মাস্টারপ্ল্যানে এ রিং রোড প্রকল্পটি থাকলেও তা নির্মাণে স্থানীয়রা নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তবে ২০১১ সালের জুন মাসে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন শুরু করে ২০১৭ সালে শেষ করার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে ২০১৯ সালে শেষ হবার কথা ছিল তাও শেষ হয়নি। 

আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পের কাজ আদৌ শেষ হবে কিনা তা প্রশ্নবিদ্ধ। পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটার এই সড়কের পাশে ৫ কিলোমিটার জায়গায় বিশ্বমানের পর্যন কেন্দ্র তৈরী করার কথা থাকলেও তা থেমে গেছে।

বর্তমানে এই সড়কটিকে ৩০ ফুট উঁচু করতে মাটি ভরাটের কাজ চলছে ফৌজদারহাট অংশে। মাটি ভরাটের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে কালভার্ট ও ব্রীজ নির্মাণের পাশাপাশি একটি রেলপথের উপর দিয়ে একটি বড় ব্রীজ নির্মাণ ও বেড়বিাঁধ রক্ষায় বøক নির্মান ও স্থাপনের কাজ চলছে। এছাড়াও নির্মাণ করা হচ্ছে স্লুইচ গেইট। কর্ণফুলীর মোহনায়  চলমান টানেলের সঙ্গে এই রাস্তার সংযোগে বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে সবচেয়ে বেশি।  

এই সড়কটি ১৭ কিলোমিটার হলেও এরমধ্যে ১৫ দশমিক ২ কিলোমিটার কোস্টাল রোড এবং ২ দশমিক ১৫ কিলোমিটার ফিডার রয়েছে। ১নং ফিডার রোড পতেঙ্গা থেকে কাঠগড় পর্যন্ত, ২নং ফিডার রোড বড়পুল থেকে পোর্ট কানেটিং রোডের সঙ্গে যুক্ত হবে এবং ৩ নং ফিডার রোডটি সাগরিকা বিভাগীয় স্টেডিয়ামের পাশে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। ২ হাজার ৪২৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে এ রিং রোডের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এরমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ১ হাজার ৭২০ কোটি টাকা ও জাইকার অর্থায়নে ৭০৬ কোটি ৩ লাখ টাকা। মূলত এত ব্যয়ের পেছনে রয়েছে পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত বেড়িবাঁধকে ৩০ ফুট উঁচু করে কোস্টাল রোডের ১৫ দশমিক ২ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ। এরমধ্যে সাগরিকা জহুর আহমদ স্টেডিয়াম সংলগ্ন ফিডার রোড-৩ এর আওতায় সড়কের দৈর্ঘ্য হচ্ছে শূন্য দশমিক ৯৫ কিলোমিটার। যার প্রস্থ ১৫ দশমিক ৬০ মিটার। ওই এলাকা ভূমি অধিগ্রহণের পরিমাণ ৭ দশমিক ৬ একর। এই ফিডারের আওতায় শূন্য দশমিক ৪৯৫ পয়েন্টে একটি রেলওয়ে ওভার ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনাও ছিল।

বাংলাধারা/এফএস/এফএস

আরও পড়ুন