১৮ মার্চ ২০২৬

ইসলামী ছাত্রী সংস্থা কোথায়?

মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক»

দেশের আনাচে কানাচে বিচরন করছে ইসলামী ছাত্রী সংস্থার নামে কিছু জঙ্গী নারী সদস্য। তবে এ সংগঠনের পেছনে কাজ করছে শিবিরতান্ত্রিক কলেজ  ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীরা। চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থেকে ২০১৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর জেলা পুলিশের অভিযানে গ্রেফতার হওয়া ৫ নারী জঙ্গীকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য উঠে এসেছিল। এসব নারীদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত বইগুলো ইসলাম ও বিজ্ঞান ভিত্তিক হলেও মুলত ইসলামের তথ্যগুলোকে ঘুরিয়ে মগজ ধোলাইয়ের ব্যবস্থা করার মতোই। কিন্তু এই নারী জঙ্গী সংগঠনটি হঠাৎ করেই উধাও। গোয়েন্দা সংস্থার কাছেও কোন তথ্য নেই। 

এসব নারীরা এখনও সুক্ষতার সঙ্গে সংগঠিত হবার অপচেষ্টা করছে বলে পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে উঠে এসেছিল। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী সংস্থার এসব কর্মীরা অতি গোপনে ও পারিবারিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ সংগঠনের কর্মী ও সংগঠকরা তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একসময় সুপ্ত অবস্থায় থাকা এই সংগঠন বর্তমানে গর্জে উঠার নানা পরিকল্পনা চালাচ্ছে। এলাকা ভিত্তিক  ও ঘরোয়া প্রচার প্রচারনার মাধ্যমে মা, খালা, আপু ও ভাবী বলেই সূচ হয়ে ঢুকছে  মানুষের বাসা বাড়ীতে।

পুরোদমে কাজ করছে মহিলা কলেজ, মাদ্রসা ও মহিলা হোস্টেলকে কেন্দ্র করে। এছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও চলছে প্রচার ও সাথী বানানোর অপচেষ্টা। তবে নাম সর্বস্ব এ সংগঠনটির কোন সাইনবোর্ড বা অফিস কার্যালয়ের অস্তিত্ব এখনও খুঁজে পায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে সংগঠনটির কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এমন তথ্য ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারীতে ছিল র‌্যাব সেভেনের অভিযানে।

সংগঠনটির পরিসংখ্যানে ও উদ্ধারকৃত ঐ লিফলেটে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ১৯৭৯ সাল থেকেই ইসলামের সঠিক প্রচারণার নামে এ সংগঠনটি কাজ শুরু করছে। দীর্ঘ প্রায় ৪২ বছর সংগঠনটি কার্যকর হলেও অসিএত্বর বাস্তবতা খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। তবে ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম মহানগরীকে ঐ সংগঠনটি তাদের কর্মসূচির আওতায় আনতে উত্তর ও দক্ষিণ দুটি ভাগে ভাগ করেছে। চট্টগ্রাম মহানগরী নতুনভাবে কজে শুরু করলেও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অফিস কক্ষ, ল্যাপটপসহ বায়তুল মালের  জন্য নগদ অর্থের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল সংগঠনের সভানেত্রীর এক চিঠিতে।

এই চিঠি নারীদের উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছিল এমন সংগঠনের সভানেত্রী সুমাইয়া আফরোজের পক্ষ থেকে। কক্সবাজারের রহিমা  নামের এক নারী জঙ্গীর দেওয়া তথ্যেই র‌্যাব সেভেন খুজে পেয়েছিল তাদের সংগঠিত হবার নানা পরিকল্পনা। উদ্ধারকৃত  লিফলেটে সংগঠনটির কথা উল্লেখ থাকলেও অবস্থানের কোন ঠিকানা নেই। কক্সবাজারের মগনামা এলাকার রহিমাকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে নারী সংগঠনের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত হয়েছে র‌্যাব। উদ্ধারকৃত চিঠি ও লিফলেট থেকেই মূলত জঙ্গী ছাত্রী সংস্থার পরিচয় উঠে আসে।

অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম মহানগরী ও উপজেলা মিলে ৩১টি থানার আওতায় সাপ্তাহিক ও ইসলামী মাহফিলের নামে বিভিন্নস্থানে গোপন বৈঠক চলছে যা পুলিশ এখনো সন্ধান করতে পারেনি। তবে মঙ্গলবার বোয়ালখালীতে জেলা পুলিশের অভিযানের মধ্যদিয়ে র‌্যাবের পর পুলিশের নজরে এসেছে নারী জঙ্গী সংগঠন ইসলামী ছাত্রী সংস্থার। তবে এ ধরনের বৈঠকে সংগঠনের ৮ থেকে ১০ সদস্য উপস্থিত থাকে। এই সদস্যদের আবাসস্থলে পৃথকভাবে নির্দিষ্ট দিনে জমায়েত হয়। প্রত্যেক সদস্য প্রত্যেক সপ্তাহে পৃথকভাবে নিজ নিজ আবাসস্থলে এসব সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করে।

আরো অভিযোগ রয়েছে, বিশেষ করে নগরীর বিভিন্ন বাসাবাড়ি, বস্তি ও গিঞ্জি এলাকাগুলোতে এ ধরনের বৈঠক সবচেয়ে বেশি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সদস্যরা কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে বৈঠকে অংশ নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া বিভিন্ন মহিলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এ সংগঠনের কর্মী ও সদস্যরা সমর্থক কালেকশনের মধ্যে দিয়ে নিজেদের প্রচার ও কর্মসূচি পালন করছে।

পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছে ছাত্রী সংস্থার পক্ষ হয়ে কাজ করার বিষয়টি। তবে বিশেষ তথ্য বের করতে রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে ১০ দিনের। রিমান্ডে আনা গেলেই তাদের প্রচার প্রচারনাসহ বেশকিছু তথ্য বের করা যাবে। যা থেকে আগামীতে এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত অন্যদের খুজে বের করা যেমন সহজ হবে তেমনিসংগঠিত হবার আস্তানাগুলোও নিশ্চিত করে অভিযান পরিচালনাকরা যাবে।

র‌্যাব সেভেনের তথ্যে পাওয়া গেছে, এ সংগঠনের আওতায় থাকা সদস্য ও তাদের অভিভাবকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ২০১৫ সালের কার্যক্রম হিসেবে ৪টি শিক্ষা শিবিরের আয়োজন করা হয়েছিল। ১০টি শিক্ষা বৈঠক ও ১১টি মান্নোয়ন কর্মশালার আয়োজন প্রকাশ করা হয়েছিল ২টি ম্যাগাজিনে। এছাড়া ৫ ধরনের লিফলেট প্রকাশ ও ছাত্রী কল্যাণ ফান্ডের জন্য মোটা অঙ্কের টাকা কালেকশনের একটি টার্গেট রয়েছে তাদের। তবে তাদের পরিকল্পনায় থাকা এসব কার্যক্রমের জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল কমপক্ষে ২ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে চট্টগ্রাম মহানগরীর উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী সংস্থা চট্টগ্রাম মহানগর দক্ষিণের সভানেত্রী সুমাইয়া আফরোজের পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত লিফলেটটি নারীদের উদ্দেশ্যে বিতরণ করা হয়েছিল।

সংগঠনটির ২০১৪ সালের পরিসংখ্যান থেকে পাওয়া গেছে, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নবীন বরণ, ভাষা দিবসে সাহিত্যের আসর, স্বাধীনতা দিবসে পুস্তক ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনী, পিঠা ও আচার উৎসব, শবে মেরাজ, আশুরা উপলক্ষে আলোচনা সভা, ঈদ পুনর্মিলনী, দোয়া ও ইফতার মাহফিল, দেয়ালিকা ও পোস্টারিং ইত্যাদি কার্যক্রমেও তারা অংশ নিচ্ছে।এছাড়াও ইসলামী শিক্ষা দিবস, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ক্রোড়পত্র, নারী দিবস, শবে বরাত ও আশুরা উপলক্ষে লিফলেট বিতরণ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে হ্যান্ড ম্যাগাজিন, বার্ষিক প্রকাশনা, ক্যালেন্ডার, ডায়রি, সিয়াম, প্রত্যয়, ছাত্রী বার্তা ও সাময়িকীর কাজও করা হয়েছিল।

২০১৫ সালেও নারী এ সংগঠনটির সদস্য মুষ্টিমেয় তবে  কর্মী রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭৭ জন। সমর্থক প্রায় ৮ হাজার। আবার সদস্য প্রার্থীও রয়েছে মাত্র কয়েকজন।  অগ্রসর কর্মী হিসেবে কাজ করছে ৬৮ জন যারা নারী, তরুণী ও কিশোরী। ২০১৫ সালে এ সংগঠনে সদস্য বেড়েছে মাত্র ৫ জন । অগ্রসর কর্মী হিসেবে আরও ১০ জন কাজ করছে। কর্মী হিসেবে নতুনভাবে ৯৮ জন ও সদস্য প্রার্থীর জন্য অপেক্ষমান ছিল ৬ জন। কিন্তু গত ৬ বছরের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। প্রশ্ন উঠেছে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দায়িত্ব নিয়ে।

চট্টগ্রাম মহানগরীর দক্ষিণ অংশে সংগঠনটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে অধ্যায়নরত নারী হিসেবে রয়েছে ১ লাখ। এর মধ্যে সভানেত্রী সুমাইয়া আফরোজের হিসেব অনুযায়ী শতকরা ৮ ভাগ নারী অর্থাৎ প্রায় ৮ হাজার জন তাদের সঙ্গে কাজ করছে। মহানগরীর দক্ষিণ অংশের নারী সদস্যরা পার্বত্য অঞ্চলসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ করছে। চলছে দাওয়াতী কাজ ও জনশক্তির প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। এলাকাভিত্তিক ধর্মীয় প্রচারণার নামে বিভিন্ন ঘরে ঘরে ৮ থেকে ১০ জনের সদস্যরা কাজ করে যাচ্ছে। প্রায় ১১২টি ইউনিটে ভাগ করা হয়েছে সংগঠনটির সদস্যদের। র‌্যাব-৭ সূত্রে জানা গেছে, দেশব্যাপী প্রশিক্ষণে বিশাল নেটওয়ার্ক নিয়ে নেমেছে ৮ হাজার সদস্যের এই মহিলা জঙ্গী সংগঠন। ২০১৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী হালিশহরের বসুন্ধরাস্থ বি.এস ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে ইসলামী ছাত্রী সংস্থার প্রায় অর্ধশত লিফলেট উদ্ধার করা হয়। ঐ লিফলেটে ছাত্রী সংস্থাটির দাওয়াতী কর্মকান্ড, ব্যয়বহুল কার্যক্রম ও প্রকাশনা, দাওয়াতী কর্মসূচি, প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচিসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের উল্লেখ রয়েছে।

বাংলাধারা/এফএস/এফএস

আরও পড়ুন