সায়ীদ আলমগীর, কক্সবাজার»
কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারার বগাচতর এলাকায় ব্যক্তি মালিকানাধীন ফসলি জমি থেকে দীর্ঘদিন ধরে জোরপূর্বক মাটি লুট করে নিচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী চক্র। রীতিমতো ফসলি জমিকে এক একটি মিনি পুকুরে পরিণত করেছে মাটি ও বালু দস্যুরা। স্কেভেটর ও ড্রেজার মেশিন বসিয়ে প্রকাশ্যে ট্রাক ভর্তি করে এসব মাটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটা ও রেললাইন সড়ক এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে।
ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকরা প্রশাসনের কাছে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দিলেও ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্টরা। এতে করে গত দুই বছর ধরে প্রায় ৩০ একর জমিতে চাষাবাদ বন্ধ রয়েছে বলে দাবি ক্ষতিগ্রস্তদের। অভিযোগ উঠেছে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ফসলি জমিতে দীর্ঘদিন ধরে তান্ডব অব্যাহত রেখেছে মাটি লুটকারী চক্রটি।
এ বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের পক্ষে চকরিয়া ইউএনও এবং জেলা প্রশাসক বারাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন রেজাউল করিম চৌধুরী নামে ক্ষতিগ্রস্ত একজন।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ডুলাহাজারা ইউনিয়নের পশ্চিম মাইজপাড়া এলাকার মৃত মৌলভী এফজালুল হকের ছেলে আমিনুল এহেছান চৌধুরী ওরফে সাইফুল চেয়ারম্যান এবং সজিবের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র ফসলি জমি থেকে এসব মাটি লুট করে নিচ্ছেন। অভিযুক্ত এ চক্রের সদস্য হিসেবে হামিদ রেজা সাগর, আবু নাঈম মো. ইকবাল, আরমানুল হক চৌধুরী, দিদারুল হক চৌধুরী, তাজবির জাহান চৌধুরী শাকিল, আব্দুস সালাম, রায়হান, নজির হোছাইন, নুরুল ইসলাম, নেজাম উদ্দিন, জিয়াউল করিম ও রেজাউল ওরফে সোনা মিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, ডুলহাজারা বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের পূর্ব দক্ষিণ সীমানার দেয়াল ঘেঁষে আনুমানি ৩০ একর তিন ফসলি জমির মাটি খুঁড়ে ফেলা হচ্ছে। চাষী জমির শ্রেণী পরিবর্তন করে সেখানে স্কেভেটর দিয়ে ফসলি জমিতে এক একটা মিনি পুকুর করা হয়েছে। এরপর পুকুর থেকে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে উত্তোলন করা হচ্ছে বালি। পুকুরের পাশেই রাখা হচ্ছে কয়েকটি বালুর স্তুপ।
গর্তের কারণে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের সীমানার দেয়াল হেলে পড়েছে। যেকোনো সময় ধসে যেতে পারে পাশের কয়েকটি পাহাড়ও। বালি তোলার কারণে ইতোপূর্বেও একবার সাফারি পার্কের দেয়াল ধসে পড়েছিল। এ বিষয়ে মামলাও করে সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। থামেনি বালু চক্রের লুটের গতি।
স্থানীয়রা জানান, সম্প্রতি গর্তে নেমে বালি উত্তোলন করতে গিয়ে মাটিচাপা পড়ে সেখানে একজন শ্রমিক নিহত হয়। এ কারনে বেশ কিছুদিন মাটি ও বালি উত্তোলন বন্ধ থাকলে কয়েকদিন ধরে আবার শুরু হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিক ভূক্তভোগি রেজাউল করিম বলেন, প্রশাসনকে লিখিতভাবে বারবার জানানোর পরও কোনো উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্টরা। এতে করে দুই বছর ধরে শুধু আমার পরিবারেরই প্রায় ১৬ একর জমিতে চাষাবাদ বন্ধ রয়েছে। তার দাবি, স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ফসলি জমির উপর তান্ডব চালাচ্ছে চক্রটি।
তিনি আরো বলেন, জমির মালিকদের আর্তনাদ শুনছে না কেউ। দেখলেও না দেখার ভান করে থাকছে প্রশাসন।
একই অভিযোগ ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিক মহসীন চৌধুরী, শাহ নেওয়াজ জাহাঙ্গীর ও মাইনুল এহছান চৌধুরীর। বালিচাপা পড়ে মারা যাবার তিন দিন পর আবার বালু তোলার কারণে মাইনুল এহছান চৌধুরীর জমিতে কেটে রাখা পাকা ধানও বালির গর্তে পড়ে গেছে। এরপরও থামায়নি বালু উত্তোলন।

অভিযুক্তদের সমন্বয়ক হিসেবে প্রধান অভিযুক্ত আমিনুল এহেছান চৌধুরী ওরফে সাইফুল চেয়ারম্যানের বক্তব্যের জন্য মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু মঙ্গলবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একাধিকবার কল করেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। বক্তব্য নিতে ডুলাহাজারা বাজার এলাকায় তার অফিস গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে, অভিযোগ স্বীকার করে নিয়ে আরেক অভিযুক্ত সজিব অনেকটা দাম্ভিকতার সাথে বলেন, আমরা মাটি না দিলে রেললাইন, সড়কসহ সরকারের উন্নয়ন কাজ গুলো বন্ধ থাকবে। তাই যেখান থেকে পারছি মাটি ও বালু সংগ্রহ করে দিচ্ছি। বগাচতর এলাকার ফসলি জমির নিচে প্রচুর বালু মিলছে। তাই কিছু জমি একসনা লীজ নিয়ে মাটি ও বালু নিচ্ছি। এটা করতে গিয়ে পার্শবর্তী জমির মাটিও ভেঙ্গে আসছে সেটা ঠিক। কিন্তু এতে কৃষি আইন লংঘন হয়েছে সেটি জানি না।
ফসলি জমি থেকে মাটি ও বালু উত্তোলন বন্ধ করতে চাইলে তাদের চক্রের পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে থাকা নুরুল আজিমের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
এ বিষয়ে নুরুল আজিম বলেন, মূলত যুবলীগ নেতা হাসান ইসলাম আদর, মেম্বার নুরু এবং চকরিয়া উপজেলা যুবলীগের একজন শীর্ষ নেতার নেতৃত্বে ফসলি জমি থেকে মাটি নেয়া হচ্ছে। আমি শুধু তাদের অধীনে থেকে কাজ তদারক করি।

অভিযোগ অস্বীকার করে যুবলীগ নেতা হাসান ইসলাম আদর বলেন, কারা ফসলি জমি থেকে মাটি লুট করছে তাদের তালিকা রেলের সাথে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে পাওয়া যাবে। সেখানে আমার নাম থাকলে আমিও শাস্তি মাথা পেতে নেব।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও সৈয়দ শামসুল তাবরীজ বলেন, ফসজি জমি থেকে জোরপূর্বক মাটি লুটের বিষয়ে একটি অভিযোগের একটি কপি জেলা প্রশাসন থেকে আমার কাছে পাঠানো হয়েছে। অতি শীগগিরই জড়িতের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এর আগেও সেখানে কয়েকবার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসাক (রাজস্ব) আমিন আল পারভেজ বলেন, অভিযোগের সত্যতা পেলে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।
বাংলাধারা/এফএস/এফএস












