মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক»
বঙ্গবন্ধু টানেল আর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ শেষ হলে চট্টগ্রাম পাবে বিশাল এক পরিপূর্ণতা। টানেলের সুবিধা পাবে কক্সবাজারগামীরা। আর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সুবিধা পাবে পতেঙ্গা ও বিমান বন্দরের যাত্রীরা। ২০২২ সালে চট্টগ্রামের টার্নিং পয়েন্ট হবে পতেঙ্গা। এ টার্নিং পয়েন্ট গড়ে উঠার পেছনে রয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের(চউক) এর দুটি ও বাংলাদেশ ব্রিজ অথোরেটি(বিবিএ) এর একটি প্রকল্প। উল্ল্যেখ, ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমূদ্র উপকূলে গড়া এপ্রোচ সড়কে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান টানেল’ এর বোরিং কার্যক্রমের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দেশের একমাত্র টানেলের স্বপ্ন যাত্রা।
ইতোমধ্যে প্রায় ৭৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে টানেলের দুটি টিউবের নির্মাণ শেষে রাস্তা নির্মাণের কাজ চলছে। এদিকে চউকের ‘এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে’র কাজ চলছে দ্রুততম গতিতে। তবে এটির কাজ ২০২৩ সাল নাগাদ সম্পূর্ণ রুপে শেষ হতে পারে এমন ধারনা প্রকৌশলী ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের। আগামী বছরের মধ্যে শেষ হবে বিবিএ’র তত্বাবধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান টানেল।

এদিকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে শেষে সম্পূর্ণ পর্যটকদের পদচারনায় মুখরিত হয়ে উঠে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত। নতুন আঙ্গিকে গড়ে তোলা সৈকত পার সম্পুর্ণরুপে থাইল্যান্ডের পাতায়া বীচের আদলে গড়ে তোলা হয়েছে। প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার রিং রোড দাবড়ে বেড়াচ্ছে পতেঙ্গা ও এয়ারপোর্ট কেন্দ্রিক গাড়ীগুলো। যেখান থেকে পর্যটকরা তিনটি স্তরে দাড়িয়ে বসে বা হেঁটে পতেঙ্গা সমূদ্র উপকূল উপভোগ করছে। শুধু তাই নয় চউকের নির্মিতব্য পাঁচতারকা হোটেলে রাত্রি যাপনের মাধ্যমে কক্সবাজার নয় পতেঙ্গায় বসেই সমূদ্রের বিশালতায় নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছে মনের আনন্দে। পর্যটনের জন্য এখন আর থাইল্যান্ডের পাতায়াবীচ নয়, পতেঙ্গা বীচ হয়ে গেছে এর চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় ও সুবিধাপূর্ণ জোন।
দেশীয় পর্যটকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্যা চট্টগ্রাম শহরের উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। সে অনুযায়ী চট্টগ্রামে গত ১০ বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন শেষ হয়েছে। তৃতীয় মেয়াদে এসে তিনি আবারো চট্টগ্রামের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখছেন। চট্টগ্রাম নগরী একসময় শুদু বাংলাদেশের বন্দর নগরী হিসেবে পরিচিত ছিল। এখন বিশ্বের কাছে পর্যটন নগরী হিসেবে পরিচিত। বন্দর নগরী চট্টগ্রামে পর্যটন শিল্পের বিকাশের যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন উদ্যোগ। চট্টগ্রামবাসীর মতে, আওয়ামীলীগ সরকার টানা তিনবারসহ চতুর্থবারের মত নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের দেশকে বিশ্বের কাছে উন্নয়নশীল দেশে পরিনত করেছেন। এখন আমরা আর ঋণের বোঝা নিয়ে উন্নয়ন করতে চাই না। প্রধানমন্ত্রী এদেশের মানুষকে ক্ষুদামুক্ত ও দারিদ্র্যমুক্ত করেই ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের মাইলফলকে পরিণত করার টার্গেট নিয়ে এগুচ্ছেন।

বাংলাদেশ সেতু বিভাগের পক্ষ থেকে জানা গেছে, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান টানেল’ দেশের প্রথম টানেল। সেতু বিভাগের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশ্বের মানচিত্রে এটি একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। চায়না কমিউনিক্যাশন কন্সট্রাকশন কোম্পানী(সিসিসিসি) নামের একটি ঠিকাদারপ্রতিষ্ঠান এই টানেলের কাজ করছে। এই টানেলের মোট ব্যায় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৩ লাখ ৭৮ হাজার বা ১০৫৫ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন। এরমধ্যে সরকারী অর্থায়ন থেকে আসছে ২ হাজার ৮০০ কোটি ২৩ লাখ ৭৮ হাজার বা ৩৫০ দশমিক শূণ্য তিন মিলিয়ন। প্রজেক্ট এসিসট্যান্স থেকে বিনিয়োগ করা হচ্ছে ৫ হাজার ৬৪৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা বা ৭৫০ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন। সেতু বিভাগের হিসেব অনুযায়ী কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে বহুলেন বিশিষ্ট সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন। ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান টানেল’ মানেই ‘মাল্টি-ল্যান্ড রোড টানেল আন্ডার দ্যা রিভার কর্ণফুলী’। এই টানেলে থাকছে দুটি টিউবের ন্যায় চারলেনের সড়ক নির্মাণ পরিকল্পনা। উভয়দিকে টানেলের মুখ থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক নির্মাণ হবে।

‘বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান টানেল’ প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী হারুনুর রশিদ চৌধুরী বাংলাধারাকে বলেন, দেশের প্রথম টানেলটি উচ্চ ক্ষমতা শক্তি সম্পন্ন কারিগরি কাজ। ৭০/৮০ ফুট নিচে দিয়ে টানেলের টিউবগুলো গেছে। টিউবের মূল কাজ শেষ । এখন রাস্তা নির্মাণের কাজ চলছে। এ পর্যন্ত টানেল নির্মাণের ৭৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ২০৪১ সালের আগেই উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ। চট্টগ্রামের ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান টানেল’ শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, এই উন্নয়ন আমাদের অর্থনীতির চাকাকে ঘুরিয়ে দিবে। চট্টগ্রাম থেকেই মেরিন ড্রাইভের মাধ্যমে কক্সবাজার, টেকনাফ, মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত এই টানেল যোগসূত্র তৈরী করতে পারবে।
প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী দেখা গেছে, প্রকল্পের মোট দৈর্ঘ্য ৯ হাজার ২৬৫ দশমিক ৯৭ মিটার। টানেলের দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার। টানেলের বাহিরে পতেঙ্গা এলাকায় কাটা হবে ২০০ মিটার আর আনোয়ারায় কাটা হবে ১৯০ মিটার। কার্যপরিধি ২৫ মিটার। আনোয়ারা অংশে ফ্লাই-ওভারের দৈর্ঘ্য ৬৩৭ মিটার। মোট ৫ বছর সময়ের মধ্যে মাত্র এক বছর অতিক্রান্ত হল। তবে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই এই টানেলের কাজ শেষ হবে বলে সেতু বিভাগের কয়েক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ১২ মিটার বৃত্তাকার এই টানেল আচ্ছাদিত অংশ পতেঙ্গা অংশে ১৯৫ মিটার আর আনোয়ারা অংশে ২৩০ মিটার। ৪ লেন বিশিষ্ট এপ্রোচ সড়কের মধ্যে রয়েছে পতেঙ্গা অংশে ৫৫০ মিটার আর আনোয়ারা অংশে ৪ হাজার ৮০০ মিটার। এছাড়াও পতেঙ্গা ও আনোয়ারা উভয়দিকে ২ মেগাওয়াট বিদ্যুত সংযোগ দেওয়া হয়েছে। আবার পতেঙ্গা প্রান্তে ১৫ মেগাওয়াট স্থায়ী বিদ্যুত সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এই টানেল নির্মাণে মোট ভূমি ৩৮৩ একর।

বাংলাদেশ ব্রীজ অথরিটির পক্ষ থেকে জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বদলে যাবে চট্টগ্রামের চিত্র। গড়ে উঠবে চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে নিরবিচ্ছিন্ন ও যুগোপযোগী সড়ক যোগাযোগ, আধুনিয়কায়ন হবে বিদ্যমান সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা, সংযোগ স্থাপন হবে এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে, যুক্ত করা হবে কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা শহরের সঙ্গে ডাউন টাউনকে, তরান্বিত হবে বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ, বৃদ্ধি পাবে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা ও সুযোগ-সুবিধা, গতি পাবে প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্র বন্দরের নির্মাণ কাজ, নতুন যোগাযোগ ব্যবস্থা সৃষ্টি হবে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যে।
বাংলাধারা/এফএস/এফএস












