সায়ীদ আলমগীর, কক্সবাজার»
কক্সবাজারের মহেশখালীর শাপলাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদু রাজ্জাক (ওরফে) বার্মায় রাজ্জাক (৫৮) অভাবের সংসারে তিন বেলা খাবার যোগাতে এখনো দিনমজুরের কাজ করছেন। তার স্ত্রী শাহেনা বেগমও দীর্ঘ বছর ধরে ঝিয়ের কাজ করেন পরের বাড়ীতে। এরপরও কুলিয়ে উঠতে না পেরে ছেলে মহিউদ্দিনকে হোটেল-মোটেল জোনের এক লন্ড্রিতে সহকারির কাজে দেয়া হয়। সেখান থেকে বেরিয়ে আবাসিক হোটেলে পিয়নের কাজ করেছেন ২০১৭ সালেও। মাইনে পেতেন মাত্র কয়েক হাজার টাকা।
কিন্তু গত তিন বছরের ব্যবধানে রহস্যজনক ভাবে কয়েক কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন নিকট অতীতের ‘পিয়ন মহিউদ্দিন’। করোনা কালেও হোটেল-মোটেল জোনের ‘অঘোষিত জমিদার’ ছিলেন তিনি। তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে শতাধিক বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট। নামে-বেনামে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। সম্প্রতি এসব তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর তাকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে রহস্যের। তার ‘আলাদিনের চেরাগ’ কি তা জানতে চলছে চুলছেড়া বিশ্লেষণও।
সূত্র মতে, হোটেল-মোটেল জোনে মহি উদ্দিনের প্রায় শতাধিক বাণিজ্যিক ফ্লাট রয়েছে। যা মোটা অংকের বিনিময়ে বন্ধক ও বিভিন্ন মেয়াদে ভাড়া নিয়েছেন তিনি। এসব ফ্ল্যাট ব্যবসায় তিনি অন্তত ৬ কোটি টাকা বিনোয়োগ করেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও নামে-বেনামে রয়েছে আরো অনেক সম্পদ।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, কক্সবাজারের কলাতলী হোটেল-মোটেল জোনে গণপূর্ত ১নং ভবনে ১০টি, গণপূর্ত ২ নং ভবনে ২৭টি, গণপূর্ত ৫নং ভবনে ৪টি, গণপূর্ত ৯নং ভবনে ৫ টি, হোটেল সি-পার্ল এ ৩ টি, হাইপেরিয়ান সি ওয়েভ হোটেলে ১৮টিসহ ৬৭টি বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট মহিউদ্দীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ ছাড়াও আরো কয়েকটি বিলাসবহুল ভবনে নামে-বেনামে রয়েছে অন্তত ৩০টি বানিজ্যিক ফ্ল্যাট।
নাম প্রকাশ না করে এসব ফ্ল্যাটের মালিক পক্ষের কয়েকজন জানান, তার নিয়ন্ত্রণে থাকা ফ্লাটের মধ্যে ২০-৩টি মহি উদ্দিন ১০-২০ লাখ টাকায় বন্ধক হিসেবে নিয়েছেন। বন্ধক থাকায় এসব ফ্ল্যাটের এখন ভাড়া দিতে হয় না। বাকি ফ্ল্যাটগুলো তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম দিয়ে মাসিক ১৫-২০ হাজার টাকায় মাসিক ভাড়া নিয়েছেন। এসব ফ্লাটের জন্য তার প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এ ছাড়াও অন্তত ৫টি ফ্ল্যাট মহিউদ্দিন কিনে নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন তারা। এসব ফ্ল্যাটের মধ্যে অন্তত ৫০টি ফ্ল্যাট রোহিঙ্গা ক্যাম্প কেন্দ্রিক এনজিও সংস্থায় কর্মরত বিদেশীদের কাছে ভাড়া দিয়েছেন।
মহিউদ্দিনের বাবার নিবাস মহেশখালীর শাপলাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবদু খালেক জানান, মহি উদ্দিন রাতারাতি কোটিপতি হয়ে গেলেও সংসার চালাতে তার বাবা আবদু রাজ্জাক এখনো দিনমজুরী করছেন। তার মা শাহেনা বেগম দীর্গদিন ধরে কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত নজরুল ইসলামের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে আসছেন। মহি উদ্দিন মহেশখালীতেও কোটি টাকা মূলের কয়েকটি জায়গা কিনেছেন উল্লেখ করে তার উত্তাণ কিভাবে তা জানা নেই বলে উল্লেখ করেন এ জনপ্রতিনিধি।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল জোনের ব্যবসায়ীদের দাবি, করোনাকালে পর্যটন বন্ধ থাকায় লোকসানের কারণে যেখানে অনেকেই হোটেল-ফ্ল্যাট ছেড়ে ছিতে বাধ্য হয়েছেন, সেখানে মহি উদ্দিনের চিত্র ছিল ভিন্ন। তিনি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দিগুণ জামানত ও চড়া ভাড়ায় ৩০ থেকে ৪০টি ফ্লাট নিজের কব্জায় নিয়েছেন। এতে রীতিমতো বিস্মিত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তার গায়েবী আয়ের উৎস তদন্তের দাবি জানিয়ে তাদের অনেকেই মহিউদ্দিন ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে উল্লেখ করেন।
মুঠোফোনে জানতে চাইলে আর্থিক অনটনে ২০১৬-১৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন হোটেলে চাকরি করেছেন স্বীকার করে মহিউদ্দিন বলেন, মানুষের কি টাকা-পয়সা হতে পারে না? আমারও হয়েছে। আমি বিদেশিদের ৩০টি ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়েছি। একটি ফ্ল্যাট গড়ে ৫০ হাজার করে সেখান থেকে অন্তত ১৫ লাখ টাকা মাসে আয় হয় আমার।
তবে, ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নয় দাবি করলেও এত সংখ্যক ফ্ল্যাট ব্যবসায় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের উৎস সম্পর্কে কোন সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। ফোন কেটে দেয়ার পর ঢাকার এক সিনিয়র সাংবাদিককে দিয়ে নিউজটি প্রকাশ না করতে প্রতিবেদকের কাছে তদবীর করান মহিউদ্দিন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-২ এর এক কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রতি কক্সবাজার হোটেল-মোটেল জোনের যে কয়জনের আয়ের উৎসের খোঁজ নেয়া হচ্ছে তাদের মধ্যে মহিউদ্দিনের নামও রয়েছে। আয়কর অফিসে তার ফাইল আছে কিনা তা যাচাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, মহি উদ্দিনের মাদক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। প্রমাণ পেলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
বাংলাধারা/এফএস/এফএস












