বাংলাধারা ডেস্ক »
বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে অর্থনীতির যোদ্ধা হিসেবে একনিষ্ঠভাবে কাজ করছে তৈরি পোশাক শিল্প। জিডিপি’তে কৃষির অবদানের পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রবাহে যার অবদান সবচেয়ে বেশি, তা হচ্ছে তৈরি পোশাক শিল্প এ খাতের উদ্যোক্তা আর শ্রমিক ভাই বোনদের। জিডিপি’তে পোশাক শিল্পের অবদান প্রায় ১১ শতাংশ। রপ্তানি আয়ে ৮১ শতাংশ অবদান রাখা এ শিল্পটি প্রত্যক্ষভাবে ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে।
রোববার (৬ ফেব্রুয়ারি) চট্টগ্রামে বিজিএমইএ এর সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড লিংকেজ মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। দেশের প্রায় ৫ কোটি মানুষ কোন না কোনভাবে এ শিল্পের উপর নির্ভরশীল। পোশাক শিল্পের উপর নির্ভর করে সহায়ক বিভিন্ন শিল্প গড়ে উঠেছে; ব্যাংক, বীমা, বন্দর, হোটেল, পর্যটন, প্রসাধনী প্রভৃতি খাত প্রসার লাভ করেছে। এসব খাতের মাধ্যমে সরকারের বিপুল রাজস্ব আয় হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র বিমোচন, মিলেনিয়াম ডেভলপমেন্ট গোল অর্জন এবং বর্তমান টেকসই প্রবৃদ্ধি লক্ষমাত্রা অর্জনে আমাদের এই শিল্পটি নীরব ভূমিকা পালন করে চলছে। আর তাই পোশাকখাত আজ আমাদের জাতীয় শিল্প। এ শিল্পের গৌরব ও সুফলের ভাগীদার সবাই, সমগ্র দেশবাসী।
‘গত ৪০ বছরে গড়ে উঠা পোশাক শিল্প অনেক চড়াই উৎড়াই পার হয়ে আজকের এ অবস্থানে পৌছেছে। বিগত ১০ বছরে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, শ্রমিকের কল্যান এবং পরিবেশবান্ধব শিল্প নির্মানে যে পরিশ্রম আমরা করেছি, বিনিয়োগ করেছি এবং সফলতা পেয়েছি, তা সমগ্র বিশ্বের প্রশংসা অর্জন করেছে। এই অর্জনে উদ্যোক্তা, শ্রমিক ভাইবোন, সরকার, ব্র্যান্ড/ক্রেতা, উন্নয়ন সহযোগী ও সংশ্লিষ্ট অংশীদার সকলেরই অবদান রয়েছে। আজকের এই সংবাদ সম্মেলনে আমি পোশাক শিল্প পরিবারের পক্ষ থেকে সকলকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ।’— বিজিএমইএ সভাপতি।
বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পরীক্ষিত এবং প্রমাণিত, নিরাপদ ও স্বীকৃত শিল্প। হংকংভিত্তিক কিমা’র সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ইথিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিধি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শিশুশ্রম, কর্মঘন্টা, বেতন ও কর্মীদের সুযোগ-সুবিধার বিষয় এতে বিবেচনা করা হয়। শুধুমাত্র তাইওয়ান বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে। আমাদের প্রতিযোগী দেশ চীন, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, ভারত সবাই বাংলাদেশের পিছনে।
ফারুক হাসান বলেন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা ছাড়াও বাংলাদেশ সর্বোচ্চ সংখ্যক গ্রীন পোশাক কারখানার আবাসস্থল। বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক গ্রীন কারখানার আবাসস্থল বাংলাদেশ, যেখানে টঝএইঈ কর্তৃক প্রত্যয়িত লীড (লিডারশীপ ইন এনার্জি এন্ড এনভাইরনমেন্টাল ডিজাইন) পোশাক কারখানার সংখ্যা ১৫৭টি। এগুলোর মধ্যে ৪৭টি লীড প্লাটিনাম-রেটেড এবং ৯৬টি লীড গোল্ড-রেটেড। ৫০০টিরও অধিক কারখানা লীড সনদপত্র পাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
তিনি বলেন, আপনারা জেনে খুশি হবেন যে পোশাক শিল্পে সবুজ শিল্প গড়ে তুলতে অগ্রনী ভূমিকা পালন করার জন্য স্বীকৃতিস্বরুপ বিজিএমইএ ২০২১ টঝএইঈ খবধফবৎংযরঢ় অধিৎফ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছে। এই প্রথম কোন এসোসিয়েশন টঝএইঈ থেকে এই সম্মাননা পেলো। শিল্পের এসব অর্জনের জন্যই ডিজনীর মতো একটি ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে সোর্সিং বন্ধ করার পর আবার সোর্সিং দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে পূনঃবহাল করেছে।
তিনি আরও বলেন, অ্যাপারেল ডিপ্লোমেসী এর মাধ্যমে পোশাক শিল্পের এই সব অর্জনসমূহ পার্টনার, ব্র্যান্ড/ব্রান্ড এসোসিয়েশনগুলোর কাছে উপস্থাপন করে সুফল নেয়ার জন্য বিজিএমইএ এর বর্তমান বোর্ড বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহন করেছে। এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় আমরা গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রথম ধাপে তৈরি পোশাকের অন্যতম রপ্তানি বাজার উত্তর আমেরিকা সফর করেছি। দ্বিতীয় ধাপে নভেম্বর মাসে আমরা ইউরোপের ৩টি দেশ যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম ও স্কটল্যান্ড সফর করেছি।
‘এ দুটি সফরেই পোশাক সাপ্লাই চেইনের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার, ক্রেতা, ব্যান্ড/ব্যান্ড এসোসিয়েশন, যুক্তরাষ্ট ও কানাডা’তে বাংলাদেশ মিশনের রাষ্ট্রদূত/হাই কমিশনার, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অনাবাসী বাংলাদেশী, আন্তর্জাতিক গনমাধ্যমের বৈঠক করেছি, অনেক ফোরামে অংশগ্রহন করেছি। শিল্পের স্বার্থ রক্ষায় সর্বাত্মক আলোচনা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়েছি, যৌক্তিক মূল্য আদায়ের বিষয়ে নেগোশিয়েট করেছি। জলবায়ূ পরিবর্তনে ম্যানুফ্যাকচারারদের দায়িত্বের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইন পার্টনারদের দায়িত্বশীলতা নিয়েও কথা বলেছি। আলোচনায় আমাদের শিল্পে বিগত দশকে অর্জিত অগ্রগতি ও সম্ভাবনার বিষয়গুলো তুলে ধরেছি।’
ফারুক হাসান বলেন, কোভিড মহামারির কারনে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এক প্রচন্ড বাস্তবতার সম্মুক্ষীন হয়। বিজিএমইএ এর জরিপ অনুযায়ী ১১৪৫টি কারখানার প্রায় ৩১৮ কোটি ডলার মূল্যের ক্রয়াদেশ বাতিল হয়। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতারা রপ্তানিকৃত পণ্যের দাম দেয়নি। অনেকে দেউলিয়া হয়ে গেছে। তারপরও বিজিএমইএ’র বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস ও সরকারের নীতি সহায়তায় শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে।
বিজিএমইএ সভাপতি আরও বলেন, আমরা প্রতিটি ক্রেতার সাথে আলাদা-আলাদাভাবে আলোচনা করেছি। তাদেরকে আস্থার সম্পর্কে ফিরিয়ে আনতে সফল হয়েছি। সেই সাথে বিজিএমইএ’র নেতৃত্বে যে হেলথ প্রোটকল তৈরি ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে তার সুফল হিসেবে আমরা শ্রমিকদের নিরাপদ রাখতে পেরেছি। এর সুফল হিসেবে ক্রেতারা আজ আমাদের উপর আস্থা রাখতে পারছেন, আমাদের রপ্তানি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।
করোনা মাহামারি মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রীর দেয়া প্রনোদনা প্যাকেজটি শিল্পকে সেই কঠিন সময়ে টিকে থাকতে সহায়তা করায় তিনি প্রধানমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন।
ফারুক হাসান বলেন, যদিও বা রপ্তানি ঘুরে দাড়াঁতে শুরু করেছে, ২০২১ সালে মার্কিন বাজারে আমাদের রপ্তানি ২০২০ এর তুলনায় ৪৩.৬২ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে একই সময়ে ইইউ বাজারে প্রবৃদ্ধি ছিলো ২৭.৭৪ এবং ২০২০ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বরের তুলনায়, ২০২১ সালের ৪র্থ ত্রৈমাসিকে (অর্থাৎ অক্টোবর- ডিসেম্বর ২০২১) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ৭৫.৭১ বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ড করেছে। এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটা কিন্তু সুখকর নয়। কারন, রপ্তানি বাড়লেও শিল্পটি একটি চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে। প্রকৃতপক্ষে, উদ্যোক্তারা ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয় ও সাপ্লাই চেইনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সংগ্রামরত থেকেই শিল্পকে টিকিয়ে রাখছেন।
তিনি বলেন, উদ্যোক্তারা নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি ও সবুজ শিল্পায়নে বিপুল বিনিয়োগ করলেও ক্রেতারা সে অনুযায়ী মূল্য দিচ্ছেন না। ২০২০-২১ সময়ে আমাদের পোশাকের গড় দরপতন হয়েছে ৩.৩৫। যদিওবা চলতি সময়ে বিগত সময়ের তুলনায় মূল্য কিছুটা বেড়েছে, সেটা বেড়েছে বিশ্বব্যাপী কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধির কারণে মালিকরা এর সুফল নিতে পারেননি। এর বিপরীতে কারখানার উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে অনেক।
‘পোশাক কারখানাগুলো এখনো কোভিড মহামারির ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। গত ১ বছরে সুতার দাম ৬০ শতাংশ বেড়েছে। কনটেইনার পরিবহন খরচ ৩৫০-৫০০ শতাংশ বেড়েছে। তাছাড়া, ডাইস, কেমিক্যাল এর খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে ৪০ শতাংশ। গত ৫ বছরে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম যথাক্রমে ৫৯ ও ১৩ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি, করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কারনে কারখানার উৎপাদন খরচ দিন দিন বেড়েছে। এ সময়টিতে পণ্যের দরপতন মোটেই কাম্য নয়।’
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, শিল্প বর্তমানে একটি সন্ধিক্ষণে রয়েছে। বিশ্বব্যাপী ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট এর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় শিল্পে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য সরকারের নীতিসহায়তা জরুরি। বিশেষ করে কোভিড মোকাবেলায় প্রদত্ত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বিদ্যমান ১৮ মাস থেকে বাড়িয়ে ৩৬ মাস করা হলে তা শিল্পের প্রতিযোগী সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে আমরা মনে করি।
‘উদীয়মান পরিস্থিতি শিল্পের জন্য চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ দুটিই সৃষ্টি করেছে। আমরা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সুযোগগুলো গ্রহণ করতে চাই। এখন সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় হয়েছে, দেশের কর্মীগোষ্ঠীকে শ্রমিক হিসেবে বাইরের শ্রম বাজারে পাঠানো হবে, নাকি তাদেরকে দেশের অর্থনীতি গড়ার কাজে লাগানো যুক্তিযুক্ত হবে।’
‘শিল্পখাত, বিশেষ করে রপ্তানিমুখী খাত আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে চলেছে, যার গুরুত্ব প্রতিটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে উল্লেখ রয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে একটি স্বনির্ভর ও উন্নত অর্থনীতির দেশ হওয়ার যে রূপকল্প নিয়ে আমরা কাজ করছি, তা অর্জনের জন্য রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের কোন বিকল্প নেই। আমরা আগামী দিনে কোথায় নজর দিব, কোথায় কোথায় বিনিয়োগ করা আমাদের জন্য কৌশলগতভাবে সঠিক হবে সেই বিষয়গুেেলা নিয়ে বিজিএমইএ বেশকিছু বিষয়ে গবেষণা কাজ হাতে নিয়েছে। সময়মতো এগুলো আপনাদের সাথে শেয়ার করবো।’












