১৭ মার্চ ২০২৬

পরিবারের বন্ধন অটুট রাখাই হোক ভালোবাসা দিবসের চ্যালেঞ্জ

ফেরদৌস শিপন »

অস্থির সময়ের মধ্যে চলছি আমরা। অস্থিরতার ভয়াল থাবা গোটা পৃথিবীতে চেপে বসছে। মানুষের মানবিক মনে পরিবর্তন এসেছে। পৃথিবীতে মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ আশ্রয়স্থল তার নিজস্ব পরিবার। দিনশেষে যাদের কাছে ফিরলে দূর হয় সমস্ত ক্লান্তি, জীবনকে মনে হয় রঙিন- তাদের নিয়েই আমাদের পরিবার। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন বজায় থাকে পরস্পর সম্মান ও ভালোবাসার মাধ্যমে। আপনজনকে খুশি রাখলে পরিবারে শান্তি বজায় থাকে। সত্যিকারের সুখী হওয়া যায়।

সুখ একটি মানবিক অনুভূতি। বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে ‘বাংলাধারা ডটকম’ চট্টগ্রামের ৭ তরুণ পরিবারের কর্তাদের মুখোমুখি হয়েছিল। তাদের ভাষ্যমতে, পরিবার হচ্ছে একখণ্ড ‘সুখ’। মনের একটি অবস্থা বা অনুভূতি যা ভালোবাসা, তৃপ্তি, আনন্দ বা উচ্ছ্বাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। জৈবিক, মানসিক, মনস্তাত্ত্বিক, দর্শনভিত্তিক এবং ধার্মিক দিক থেকে সুখের সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং এর উৎস নির্ণয়ের প্রচেষ্টা সাধিত হয়েছে। তবে সঠিকভাবে সুখ পরিমাপ করা অত্যন্ত কঠিন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতালের প্রধান উদ্যোক্তা এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-পরিচালক ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া বলেছেন, পরিবারই হলো রাষ্ট্র ও সমাজের মূল ভিত্তি। পরিবার থেকেই একজন নাগরিকের সৃষ্টি হয়। সন্তানের মানসিক বিকাশে বাবা-মায়ের ভালবাসার বিকল্প নেই। তাতে একদিকে যেমন আপনি ভাল থাকবেন তেমনি দেশটাও সুনাগরিকে ভরে যাবে। একজন সুনাগরিকই পারে দেশটাকে বদলে দিতে।

দৈনিক আজাদীর চীফ রিপোর্টার হাসান আকবর জানিয়েছেন, পরিবারই হলো মানুষ গড়ার প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র। ভালোবাসার জন্ম হয় পরিবার থেকেই। ভালোবাসা বিকশিত ও পরিপূর্ণতা লাভ করে এ পরিবারেই। আসুন, পরিবারকে ভালোবাসি।

বড়তাকিয়া গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও জেসিআই বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট নিয়াজ মোর্শেদ এলিট বলেন, একজন মানুষ যত বড়ই হোক না কেন তার সম্পূর্ণ আশা-ভরসার কেন্দ্র থাকে পরিবার। পরিবারের সুখ-দুঃখ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে। পরিবারের সুখই হচ্ছে প্রকৃত সুখ।

এলবিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান ও জেসিআই চট্টগ্রাম কসমোপলিটনের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রাইসুল উদ্দিন সৈকত বলেছেন, পৃথিবীটা এই মুহূর্তে একটি অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে গেলেও এই সবকিছুর ভিড়ে বা একাকিত্বে পরিবারই একমাত্র শান্তি। পরিবার আমাদের বন্ধু, আমাদের আশ্রয়, আমাদের প্রশান্ত গন্তব্য। তাই পরিবারের সাথে প্রতিটি মুহূর্ত হোক রঙিন।

অ্যারো ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও আর জে এম ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জসীম আহমেদের মতে, পরিবার হচ্ছে, প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ উপহার, সেরা শিল্পকর্ম। পরিবারেই জীবন শুরু হয় এবং যেখানে ভালোবাসা কখনোই নিঃশেষ হয় না।

দি সিটি ব্যাংক লিমিটেডের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী বলেন, জীবনটা খুব অল্প সময়ের জন্য। ব্যস্ততার তাগিদে আমরা সবাই যেন চলমান এক যান। শত ব্যস্ততার মাঝেও আমরা নিজের পরিবারকে সময় ও সঙ্গ দিতে হবে। কারণ এর মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধনকে সুন্দর ও সুদৃঢ় করে। মনে রাকতে হবে, দিন শেষে পাশে থাকবে পরিবার।

উইন্ড অব চেইঞ্জের চেয়ারম্যান এবং হাবিব তাজকিরাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুম্মান আহমেদ বলেন, পারিবারের ভালোবাসা, পারিবারিক বন্ধন ও একটি সুখী পরিবার আমাদের স্বর্গসুখ। মনে রাখতে হবে কাজের ব্যস্ততায় যেন পরিবারের জন্য বরাদ্দ সময়ে ভাগ না বসে। আমি আমার জীবনে সুখ চাই বলে পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং কাজকর্ম, এই তিনটি ব্যাপারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলার চেষ্টা করি।

আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আপনজন আমাদের বাবা-মা এবং পরিবার। সুখে দুখে, বিপদে আপদে সবসময় আমাদের পাশে থাকে তারা। বাবা-মা এবং পরিবারের এতো ভালোবাসা পেয়েও আমরা মাঝে মাঝে উন্মাদ হয়ে পড়ি। মানুষ জন্ম থেকেই কোনো কিছু শিখে আসে না। জন্মের পর বাচ্চাদের মন একটা খালি সাদা কাগজের মতো থাকে। সমাজের এবং পরিবারের প্রত্যেকটা মানুষ থেকেই শিশুর প্রাথমিক চারিত্রিক গঠন তৈরি হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে বলা যায়, মানুষের চারিত্রিক গঠনে পরিবারের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি।

শুধু মানুষ নয়, পৃথিবীতে যেকোনো প্রাণী একাকিত্ব নিয়ে ভালো থাকতে পারে না। মানুষ সৃষ্টির পরপরই তার সঙ্গীর প্রয়োজন বোধ করতে শুরু করেছিল। একাকিত্ব থেকে মুক্তিলাভের আশায় মানুষ সুস্থভাবে বেঁচে থাকার তাগিদেই গড়ে তোলে পরিবার।

মা-বাবার নিরলস পরিশ্রমে সাজানো পারিবারিক পরিমণ্ডলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে সন্তানকে অবশ্যই নিজেদের ব্যক্তিত্ব গঠন, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি, মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষা, ধর্মীয় এবং সামাজিক আচরণবিধির অনুশীলন, জাগতিক জ্ঞান আহরণ এবং সুস্থ-মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাশক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজেদের যোগ্য করে তুলতে হবে। যোগ্য হয়ে বেড়ে ওঠাটাই যেকোনো পরিবারের কাছে তার সন্তানদের সবচেয়ে বড় দায়।

পরিবার হচ্ছে, আধুনিক সমাজের অন্যতম প্রধান উপাদান। ভালোবাসা ছাড়া একটি শক্তিশালী ইউনিয়ন তৈরি করা কঠিন, এবং এটি বজায় রাখা আরও কঠিন, কারণ এর জন্য, পরিবারে আনুগত্য এবং বিশ্বাস অবশ্যই রাজত্ব করতে হবে। শুধুমাত্র এই সবের মিথস্ক্রিয়াই সুখের চাবিকাঠি এবং পারিবারিক বন্ধনের শক্তি।

অশান্ত পৃথিবীর বুক ভালোবাসায় ভরে উঠুক, প্রেমের বীণায় বাজুক তবে মিলনের সুর। শুভকামনা ভালোবাসা দিবসের, ভালোভাবে থাকুন। অন্যকে ভালোবাসুন। ভালোবাসুন নিজেকে, নিজের পরিবারকে; প্রমাণ করুন নিজের যোগ্যতা এবং সার্থক হোক আপনার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এবং মানবিক জীবন।

লেখক : সম্পাদক, বাংলাধারা

আরও পড়ুন