১৭ মার্চ ২০২৬

রেলের ই-জিপি’তে কারসাজির টেন্ডার

মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক»

রেলের ই-জিপিতে এবার কারসাজির টেন্ডার অনলাইনে লাইভ দেওয়া হচ্ছে। চক্রান্তের অন্বেষায় কারসাজির টেন্ডার সাজাতে মরিয়া টেন্ডার ওপেনিং কমিটি। একটি চক্রকে টেন্ডার পাইয়ে দিতে যত্তসব কারসাজি চলছে ডিভিশনাল ইনভেন্ট্রি কন্ট্রোলের দফতর থেকে। ইজিপি টেন্ডারে চক্রান্তের কালিমা লেপন করতে গিয়ে টেন্ডারের নোটিশ প্রকাশ থেকে শুরু করে টেন্ডার প্রক্রিয়া নিস্পত্তি করা পর্যন্ত জড়িত সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা। অসাধু কর্মকর্তাদের সর্বাত্মক সংশ্লিষ্টতার কারনে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সরকার। ইজিপিতে ক্রয়ে সরকারের খরচ কমানোর কথা বাদ দিয়ে উল্টো টেন্ডার ক্রয় পক্রিয়ায় সরকারের ক্ষতি নিশ্চিত করা হচ্ছে।

শুধু তাই নয় সাধারণ ব্যবসায়ীরা যেন টেন্ডারে অংশ নিতে না পারে এমন নানা শর্ত দিয়ে জটিল করে তোলা হচ্ছে ই-জিপিতে টেন্ডার প্রক্রিয়া। এদেশের বাজারে সহজলভ্য এমন পণ্যে উৎপাদকের বা নির্মাতার ইন্টারন্যাশনার স্ট্যার্ন্ডাড অরগানাইজেশন(আইএসও) সার্টিফিকেট চাওয়া হচ্ছে। টেন্ডার ওপেনিং কমিটিতে চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন ডিভিশনাল ইনভেন্ট্রি কন্ট্রোল(ডিআইসি) ও মেম্বার সেক্রেটারী ডিস্ট্রিক কন্ট্রোলার অব স্টোর্স(জেনারেল) আসিফ উল ইসলাম,
অভিযোগ রয়েছে, রবিবার ১০০ এমজি প্যাসেঞ্জার কোচ মেরামত প্রজেক্টের (সেকেন্ড ফেইজ)টেন্ডার আইডি-৬৩১৯৭০ তারিখঃ ২৭/০২/২০২২ টেন্ডারটির ওপেনিংয়ের নির্ধারিত তারিখ ছিল।

সিঙ্গেল লটের এই টেন্ডারটি এর আগে গত ১৭ ফেব্রুয়ারী এ টেন্ডারের ওপেনিং তারিখ ছিল। তবে সরবরাহকারীর পক্ষে কারসাজি করতে গিয়ে সরকারী বন্ধের দিন তথা আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবসের দিনেও ২১ ফেব্রুয়ারী টেন্ডার ওপেনিংয়ের দিন ধার্য করা হয়েছিল।২৫টি আইটেমের এই দরপত্রের সিডিউলে প্রত্যেকটি পণ্যই বাজারে বিদ্যমান থাকার পরও টেন্ডার নিয়ে কারসাজি করতে গিয়ে কর্তৃৃপক্ষ নানা শর্ত জুড়ে দিয়েছে। যেসব শর্ত কোন ভাবেই প্রযোজ্য নয় পিপিআর(পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস) অনুযায়ী। টেন্ডার সিডিউলের ২৫টি আইটেমের মধ্যে বেশির ভাগই স্যানেটারী ফিটিংস এন্ড এক্সেসোরিস। এ ব্যবসায় খুচরা ও পাইকারী বাজারে লক্ষাধিক ব্যবসায়ী রয়েছে ৮টি বিভাগীয় শহরে। ২৫টি আইটেমের ম্যানুফ্যাকচারারের অথরাইজেশন লেটার চাওয়া হয়েছে টেন্ডার ডকুমেন্ট শিট ও চুড়ান্ত টেন্ডার সাবমিশনের ম্যাপে।

আরো অভিযোগ রয়েছে, এ টেন্ডারের নোটিস থেকে শুরু করে টেন্ডার ডকুমেন্ট শিট ও টেন্ডার পিপারেশন পর্যন্ত নানা ধরনের অনিয়মের নীলনক্সা উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে, গত ১৮ জানুয়ারী বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে এ টেন্ডারটির প্রস্তাবনা ছাপানো হয়। পরদিন ১৯ জানুয়ারী বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে প্রি-টেন্ডার মিটিং করা হয় এমন মিথ্যা তথ্য অনলাইনে সন্নিবেশিত করার কথা বলা হলেও তা আদৌ সত্য নয়। কারন প্রি-টেন্ডার মিটিং কাদের সঙ্গে করা হয়েছে তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ।টেন্ডার ওপেনিংয়ের সময় পেছানো হলেও কারসাজির শর্তে কোন পরিবর্তন করা হয়নি। অথচ বলা হয়েছে টেন্ডারটি সকলের জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু টেন্ডার ডকুমেন্ট শিট ও টেন্ডার পিপারেশন পেইজে ক্লিক করলেই দেখা যাবে টেন্ডার প্রক্রিয়া কতটা জটিল করা হয়েছে। টেন্ডারটি সকলের জন্য উন্মুক্ত এই তথ্যটিই যেন প্রশ্নের শিকার। এক কথায় ইজিপিতে নিয়ম নীতির বালাই নেই, রেলওয়েতে চলছে কারসাজির টেন্ডার প্রক্রিয়া।তবে আগামী ২৮ এপ্রিলের মধ্যে এ টেন্ডার কার্যক্রম চুড়ান্ত করার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়েছে।

এদিকে, ন্যাশনাল ইলেকট্রনিক গভর্ণমেন্ট প্রকিউরমেন্ট(ই-জিপি)তে নজরদারী নেই সিপিটিউ কর্তৃপক্ষের। ফলে ইজিপি’কে জটিল করে তুলছে টেন্ডার কর্তৃপক্ষ। অভিজ্ঞতার শর্ত জুড়ে দেয়ায় ইজিপি’তে টেন্ডার সাবমিট করতে পারছেন না অনেক ব্যবসায়ী। “ইলেকট্রনিক টেন্ডার, ঝুট-ঝামেলা নেই আর” সরকারের এই ধরনের টেন্ডার প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে ক্রয় কর্তৃপক্ষ। সরকারী ও স্বায়ত্বশাসিত সংস্থাগুলোতে ক্রয়াদেশ বা ঠিকাকার্য প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকার ইজিপি চালু করলেও বাস্তবায়ন করতে অনীহা অসাধু ক্রয় কর্তৃপক্ষের।

টেন্ডার শর্ত অনুযায়ী অভিযোগ রয়েছে, যারা প্রতিনিয়ত এ ধরনের পণ্য লিমিটেড টেন্ডার মেথড(এলটিএম) কিংবা ওটিএম এর মাধ্যমে সরবরাহ করার সুযোগ পেয়েছেন এমন সরবরাহকারীর সংখ্যা দুই বা ততোধিক নয়। টেন্ডার শর্তে বলা হয়েছে, সরবরাহকারীকে অবশ্যই দুই বছরের জেনারেল এক্সপেরিয়েন্স থাকতে হবে। গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ দুটি চুক্তিপত্রে কমপক্ষে ২০ লাখ টাকার পণ্য সরবরাহের নথিপত্র টেন্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানটির কমপক্ষে ২৫ লাখ টাকার তরল সম্পত্তি থাকতে হবে। যা ব্যাংক কর্তৃক টেন্ডার সাবমিটের দিনে প্রত্যয়ন পত্র থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠানটির এ টেন্ডার দাখিলের যোগ্যতা হিসেবে সুনির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এমন প্রত্যয়ন পত্রও টেন্ডারের সঙ্গে সন্নিবেশিত করতে হবে। টেন্ডারকৃত পণ্যের জন্য ম্যানুফ্যাকচারারের বা উৎপাদনকারীর অনুমতি পত্র দাখিল করতে হবে। প্রশ্ন উঠেছে, এ টেন্ডারে যে ২৫টি পণ্য ক্রয়ের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে এর বেশিরভাগ পণ্যই বাজারে বিদ্যমান রয়েছে। এরপরও কেন ম্যানুফ্যাকচারারের অথরাইজেশন লেটার চাওয়া হল তা এখন রহস্যের জাল বুঁনছে।

টেন্ডার ইনফরমেশন ফরম অনুযায়ী দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি কোন সরকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোন ধরনের মামলায় বা ঝামেলায় জড়িত কিনা তা জানতে চাওয়া হয়েছে। মূলত কোন প্রতিষ্ঠান এ ধরনের তথ্য দিবে কিনা তা সন্দেহ সরবরাহকারীদের। প্রতিষ্ঠানটির কত বছরের জেনারেল এক্সপেরিয়েন্স রয়েছে, একই ধরনের পণ্যের কতটি চুক্তি রয়েছে, এসব চুক্তির মূল্য কত, কোন সময়ে বা বছরে এসব চুক্তি করা হয়েছে, তরল সম্পত্তির ব্যাক প্রত্যয়ন রয়েছে কিনা। এমন কিছু অবান্তর শর্ত দেওয়া হয়েছে এই টেন্ডারের ডকুমেন্ট শিটে(টিডিএস)।

টেন্ডরে ক্রয়তব্য পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে, ওয়াটার ট্যাংক স্টেইনার, ওয়াটার ট্যাংক রিং, গ্যালভেনাইজ পাইপ, এলবো, পাইপ সকেট, থ্রি-ফোর থেকে হাফ ইঞ্চি রুপান্তরিত সকেট, প্লাস্টিক কল, পাইপ সংযোগের ইউনিয়ন, দুটি কোচের মধ্যকার এয়ার হোস পাইপকে সংযুক্ত করার সোয়ান ন্যাক, ট্রেন পাইপ, ট্রেন পাইপ নিপল বা পরিমাপ মতো পাইপের টুকরা, পারসেল তাকের এ্যালুমিনিয়াম পাইপ, তাকের ব্র্যাকেট, এস এস পাইপ, চেইন কভার পাইপ, সিটের পেছনে থাকা পানির বোতল ক্যারিয়ার এবং টয়লেটের টিস্যু হোল্ডার। হাতেগোনা ও খোলা বাজারে সহজলভ্য এসব পণ্যের জন্য ম্যানুফ্যাকচারারের অথরাইজেশন লেটার চাওয়া হয়েছে শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডারটি লুফে দিতে এমন অভিযোগ টেন্ডার দাখিল করতে না পারা সরবরাহকারীদের।

একাধিক সরবরাহকারী দুটি চুক্তিপত্রে ২০ লাখ টাকার সমপরিমাণ ও গত তিন বছরে একাধিক সরবরাহকারীর সঙ্গে এমন চুক্তিপত্র সম্পাদিত হয়েছে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান অভিযোগকারী সরবরাহকারীরা। এ ধরনের শর্ত জুড়ে দেয়া হলে দুই বা ততোধিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া এ ধরনের দরপত্র আহবানে যোগদান করতে পারবেন না। এমনকি নতুন কোন সরবরাহকারী অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ বঞ্চিত হবেন।

টেন্ডার ডকুমেন্ট সীট(টিডিএস) এর শর্তানুযায়ী এ ই-টেন্ডার অনলাইনে দাখিলের সময় এই পণ্যের ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড অরগানাইজেশন(আইএসও) অথবা হোম স্ট্যান্ডার্ড সার্টিফিকেট থাকতে হবে পণ্যের গুনগত মান নির্ধারনে। প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন পত্রের কপি জমা দিতে হবে। ৯০ / ১২০ দিনের মধ্যে এই টেন্ডারের কার্যক্রম শেষ করতে হবে কর্তৃপক্ষকে। টেন্ডার গ্রহীতার যোগ্যতা হিসেবে অনলাইনে সাবমিটের সময় জেনারেল এক্সপেরিয়েন্স, পূর্বে এই পণ্য বা সমজাতীয় পণ্য সরবরাহের দলিলাদি, চুক্তিপত্রের সংখ্যা, চুক্তিপত্রের মূল্য ও সময়, পণ্য সরবরাহের উৎপাদন ক্ষমতা এবং সিডিউল ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত তরল সম্পদ এবং কার্যকরী মূলধনের স্বক্ষমতা প্রত্যয়ন করতে হবে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রথম দফায় ক্রয়যোগ্য পণ্যের নাম নোটিসে উল্ল্যেখ না করেই ঠিকাদার বা সরবরাহকারীদের আড়াল করার চেষ্টা চলছে। ড্যাশ বোর্ডে টেন্ডার প্রস্তুতি বা ডকুমেন্টে ক্লিক করে দেখতে হচ্ছে বিস্তারিত। দরপত্রের প্রাক্কলিত ব্যয়কে মাপকাঠি ধরে সরবরাহকারীদের অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করার মত ঘটনা ঘটছে। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ নিয়ম বর্হিভূত। ফলে কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট কোন সরবরাহকারী ব্যতিত অন্য কোন সরবরাহকারী ই-জিপি’তে অংশগ্রহনের সুযোগ পাচ্ছেনা এমন শর্তারোপের কারনে।
আরো অভিযোগ রয়েছে, সরকারকে ক্ষতিগ্রস্থ করে অধিকমূল্যে পণ্য সরবরাহের চুক্তি সম্পাদনের অপচেষ্টা চালাচ্ছে কিনা ক্রয়কারী কর্তৃপক্ষ তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কৌশলে বিতাড়িত করা হচ্ছে সর্বাধিক সরবরাহকারীকে। সরবরাহকারীদের মতে, যেহেতু এই পণ্যের বাজার সর্বত্র রয়েছে সেহেতু কর্তৃপক্ষ বিশেষ কোন সরবরাহকারীর ইচ্ছাকৃত শর্তারোপ না করে সাধারন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সরবরাহকারীদের সুযোগ দিলে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে ক্রয়াদেশ চুক্তি সম্পাদন সম্ভব।

এ ব্যাপারে পরিকল্পনা কমিশনের সিপিটিউ’র সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট বাংলাধারা প্রতিবেদককে জানান, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস(পিপিআর) এর ৫৬ ও ৫৭ ধারা অনুযায়ী প্রকিউরমেন্ট এন্টিটিকে প্রথমে অভিযোগ করতে হবে। অভিযোগ আমলে না নিলে ওয়েব সাইটের মাধ্যমে সিপিটিউ’কে জানাতে হবে। অভিযোগ আমলে নিয়ে সিপিটিইউ কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবে।

আরও পড়ুন