spot_imgspot_img
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার নিবন্ধিত। রেজি নং-৯২
সোমবার, ২৯ মে ২০২৩
প্রচ্ছদকক্সবাজারস্বামীর দোষে স্ত্রী, বাবার দোষে দুগ্ধপোষ্য শিশুর কারাভোগ; পুলিশের বিরুদ্ধে মানববন্ধন

স্বামীর দোষে স্ত্রী, বাবার দোষে দুগ্ধপোষ্য শিশুর কারাভোগ; পুলিশের বিরুদ্ধে মানববন্ধন

spot_img

কক্সবাজার প্রতিনিধি »

নলকূপের পানি চলাচল নিয়ে বাকবিতণ্ডায় চাচা-ভাতিজার মারামারিতে নেইল কাটার (নখ কাটনি) দিয়ে ভাতিজার বাম কাঁধে জখম করে চাচা শাহজাহান। এ ঘটনায় অভিযোগ দেয়া হলে তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে চাচাকে ধরতে ব্যর্থ হয় পুলিশ। কিন্তু চাচাকে না পেয়ে দুগ্ধপোষ্য সন্তানসহ স্ত্রীকে ধরে থানায় নিয়ে আসে ঈদগাঁও থানার পুলিশ।

গত সোমবার (২০ মার্চ) দুই সন্তানসহ প্রায় ২৪ ঘণ্টা থানা হাজতে রেখে আদালতে পাঠানো হয় অভিযুক্ত শাহজাহানের স্ত্রী-সন্তানকে। কারাগারে যাবার একদিন পর অবশ্য শিশুসন্তানসহ জামিন পান ওই নারী।

অমানবিক এ ঘটনাটি প্রচার পাবার পর কক্সবাজারের ঈদগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) মো. গোলাম কবির ও অভিযান চালানো উপ-পরিদর্শক (এসআই) গিয়াস উদ্দিনের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী।

থানা হাজতের ভেতর দুগ্ধপোষ্য শিশু কোলে ও অপর শিশুকে সামনে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারীর ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঈদগাঁও থানা পুলিশের অমানবিক এ কাণ্ড প্রকাশ পায়। এ ঘটনায় অভিযান চালানো এসআইকে পুলিশ লাইনে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এসপি।

এ ঘটনার রেশ না কাটতেই গতকাল বুধবার (২২ মার্চ) ঈদগাঁও থানা পুলিশের অপর কয়েক সদস্য সাদা পোশাকে বাস স্টেশনে ট্রাক চালককে জিম্মি করে চাঁদা আদায়ের ঘটনায় প্রতিবাদ করা এক স্কুল ছাত্রকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে পুলিশের ওই সদস্যরা। এ ঘটনায় শিক্ষার্থী ওই ছেলের ঠোঁটে রক্তাক্ত আঘাত, পেটে জখম, হাতে ফেক্সার হয়েছে বলে জানিয়েছে তার সহপাঠিরা। আহত শিক্ষার্থী জাবের আহমদ জিসান। সে ঈদগাঁহ আদর্শ শিক্ষা নিকেতন (কেজি স্কুল) হতে ২০২৩ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী।

কক্সবাজারের ঈদগাঁওর জালালাবাদের ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইমরুল রাশেদসহ একাধিক ব্যক্তি থানা হাজতে থাকা শিশুসন্তানসহ নারীর ছবিটি নিজেদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট করে অভিযোগ করেন, সোমবার (২০ মার্চ) কথা কাটাকাটির জেরে নেইল কাটারের ছুরি দিয়ে চাচা শাহজাহানের আঘাতে ভাতিজা হারুন আহত হন। বাড়ির পাশের ইটভাটা এলাকায় এ ঘটনা ঘটলেও ঈদগাঁও থানার পুলিশ শাহজাহানের বাড়িতে এসে তাকে (শাহজাহান) না পেয়ে তার স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিন, দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ দুই বছরের অপর শিশুকে থানায় নিয়ে হাজতে আটকে রাখেন। পরদিন ভিকটিম হারুন তার চাচা শাহজাহান ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে এজাহার জমা দিলে ১২টার পর মামলা নথিভুক্ত হয়। ওসি ও এসআইকে তদন্ত করে নির্দোষ মা-বাচ্চাদের বাদ দিতে অনুরোধ করা হলেও অদৃশ্য ইশারায় তদন্ত ছাড়াই মামলা নথিভুক্ত করে শাহজাহানের স্ত্রী ও শিশুদের আদালতে সোপর্দ করে আর আদালত তাদের কারাগারে পাঠান। ২২ মার্চ বাচ্চাসহ মাকে জামিন দেয় আদালত।

চেয়ারম্যানসহ স্থানীয়দের মতে, ঈদগাঁওর জালালাবাদ পূর্বফরাজীপাড়া এলাকায় প্রতিবেশী মৃত নজীর আহমেদের ছেলে শাহজাহান ও মৃত আবু শামার ছেলে হারুন অর রশীদের পরিবারে নলকূপের পানি চলাচলের ড্রেন নিয়ে বাকবিতণ্ডা হয়। এ ঘটনায় শাহজাহান নেইল কাটারের ছুরি দিয়ে হারুনকে আঘাত করে আহত করে। ঘটনাটি মীমাংসাযোগ্য। কিন্তু পুলিশ স্বামীকে না পেয়ে নিরীহ স্ত্রী ও দুই শিশুকে বেআইনিভাবে থানায় নিয়ে আটকে রাখে। এটি সভ্য সময়ে চরম অমানবিকতা- মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামিল।

এদিকে, দুটি ঘটনাসহ চোরাই গরু থেকে ভাগ নিয়ে এলাকার আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতির দায়ে ঈদগাঁও থানার ওসি গোলাম কবির ও স্বামীকে না পেয়ে স্ত্রী সন্তানকে ধরে নিয়ে আসার থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) গিয়াসউদ্দিনসহ ট্রাকচালককে চাঁদাবাজির প্রতিবাদে স্কুল শিক্ষার্থীকে প্রহারকারি পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহার ও বিচার দাবিতে মানববন্ধন করেছে সব শ্রেণীপেশার মানুষ। বৃহস্পতিবার দুপুরে ঈদগাঁও বাসস্টেশনে আয়োজিত মানববন্ধনে উপজেলা আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শিক্ষার্থীসহ নানা পেশার লোকজন বক্তব্য রাখেন।

অভিযোগের বিষয়ে ঈদগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. গোলাম কবির বলেন, ভাতিজা হারুনের বাম কাঁধের হাড়ের নিচে ছুরিকাঘাত মারাত্মক ছিল। পুলিশের কাছে অভিযোগ করা হয় আঘাতকারি শাহজাহানকে ছুরি দিয়েছে তার স্ত্রী। তার কারণেই ঘটনাটি ঘটেছে। তাই পুলিশ তাকে ধরে এনেছে। তার সাথে দুগ্ধপোষ্য সন্তান থাকলেও মাকে আনতে গিয়ে শিশুরা কারাভোগ করেছে, এখানে পুলিশ নিরুপায়।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সিনিয়র আইনজীবী বাপ্পি শর্মা বলেন, মা আসামী হলে তাকে আটকের সময় দুগ্ধপোষ্য বাচ্চাও নিয়ে আসে এটা স্বাভাবিক ঘটনা। তবে, ঈদগাঁওর ঘটনাটি একটু ভিন্ন। স্বামীর অপরাধে স্ত্রীকে পুলিশ ধরে আনার ১৮-২০ ঘন্টা পর মামলা নথিভুক্ত হয়েছে বলে প্রচার পাচ্ছে। ঘটনা সঠিক হলে, মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে। কারণ, একজনের অপরাধে অপরজন সাজা ভোগ করার নজির সংবিধান দেয়নি। স্বামীর অপরাধে স্ত্রী আর বাবার অপরাধে বাচ্চারা কারাভোগ করার মতো হলো ঈদগাঁওর ঘটনাটি।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো. মাহফুজুল ইসলাম বলেন, আটক মায়ের সাথে যেহেতু দুগ্ধপোষ্য বাচ্চা আছে সেহেতু ঘটনাটি আরো সফটলি হ্যান্ডেল করা যেত। এরপরও যে অফিসারের অদূরদর্শিতার কারণে এমন বিশ্রি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাকে পুলিশ লাইনে প্রত্যাহার করে আনা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ছবিটি থানা হাজতের নয়, আদালত কাস্টডির। বাকি বিষয়গুলো সরেজমিন তদন্ত ও করণীয় বিষয়ে কাজ করছেন একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। স্থানীয় ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে বিষয়টি সুন্দর সমাধান ও অন্যরা দোষী হলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে উল্লেখ করেন এসপি।

আরও পড়ুন

spot_img

সর্বশেষ