চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। উপজেলার ৩ হাজার ৬৯৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৭৯৭ জন। অকৃতকার্য হয়েছে ১ হাজার ৯০২ জন। অর্থাৎ পাসের চেয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি। এবার উপজেলায় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৪৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১১০ জন।
গত দুই বছরের তুলনায় এবার পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৪ সালে উপজেলার গড় পাসের হার ছিল ৮২ দশমিক ৮০ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশে। এবার এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ২৩ শতাংশের বেশি।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, উপজেলার অধিকাংশ বিদ্যালয়েই ফলাফল আশানুরূপ হয়নি। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ভালো করলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে অকৃতকার্যের হার ছিল উদ্বেগজনক।
কৈনপুরা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৯৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ২৫ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে একজন। বক্তিয়ারপাড়া চারপীর আউলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ৩৫০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১০৫ জন।
উপজেলার পাঁচটি বিদ্যালয় থেকে এবার কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়নি। এর মধ্যে হাজীগাঁও শোলকাটা এস জে নিজাম উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৩৫ জন। প্রতিষ্ঠানটি থেকে কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়নি।
আনোয়ারা সরকারি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়েও এবার ফলাফলে বড় ধস নেমেছে। ১৪৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৯৮ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০ জন। গত বছর প্রতিষ্ঠানটি থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৫০ জন।
তবে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ফলাফল তুলনামূলক ভালো। উপজেলার মাদ্রাসাগুলোতে ৬০৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪৩৪ জন পাস করেছে এবং ফেল করেছে ১৭৩ জন। পাসের হার ৭১ দশমিক ৫০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৭ জন।
মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে ভালো ফল করেছে বারখাইন জামেয়া জমহুরিয়া কামিল মাদ্রাসা। এ প্রতিষ্ঠানের ৮০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭৯ জনই উত্তীর্ণ হয়েছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২০ জন। এছাড়া আল্লামা আবুল খাইর ফাউন্ডেশন পরিচালিত উম্মে হুমাইরা আরাবিয়া বালিকা মাদ্রাসায় শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে চারজন।
বারখাইন জামেয়া জমহুরিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আবদুল খালেক শওকী বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, প্রতিবারের মতো এবারও আমাদের মাদ্রাসা ভালো ফল করেছে। শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ভালো ছিল। তাই ভালো ফল এসেছে।’
কারিগরি বোর্ডেও তুলনামূলক ভালো ফল হয়েছে। উপজেলার ১৯৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৩০ জন উত্তীর্ণ হয়েছে।
ফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতি, কারিকুলাম পরিবর্তন, কোভিডকালীন শিক্ষার ক্ষতি ও ভর্তি প্রক্রিয়াসহ নানা বিষয়কে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আনোয়ারা সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস. এম. নাসির উদ্দীন বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার ফল ভালো হয়নি। শিক্ষার্থীদের লটারির মাধ্যমে ভর্তি হতে হয়। কোভিডের সময় পরীক্ষা ছাড়াই শিক্ষার্থীদের পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করা হয়েছে। পরে কারিকুলাম পরিবর্তন ও বিভাগ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ভালো ছিল না।
তিনি আরও বলেন, টেস্ট পরীক্ষায় এক-দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদেরও এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। ফলে এবার ফল ভালো হয়নি। আগামী বছর ফল ভালো করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা (ভারপ্রাপ্ত) কর্মকর্তা মাধব চন্দ্র বসু বলেন, ‘উপজেলায় শিক্ষার হার খুব খারাপ হয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ভালো করলেও বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর ফল ভালো আসেনি।’
শিক্ষকদের উদাসীনতাকে ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার অবস্থা এক দিনে খারাপ হয়নি। তিন মাস ভালোভাবে প্রস্তুতি নিলেও ফল ভালো করা সম্ভব ছিল। কিন্তু শিক্ষকরা যথাযথ মনোযোগ দেননি। শ্রেণিশিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পর্যন্ত যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়নি।
তিনি আরও জানান, ফলাফল নিয়ে উপজেলার সব প্রধান শিক্ষককে ডেকে প্রয়োজনীয় জবাবদিহি করা হবে এবং আগামী বছর ফলাফল উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।














