১৪ অক্টোবর ২০২৬

তাসাউফ জগতের মহান ব্যাক্তিত্ব হযরত গাউছুল আজম সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবা ভান্ডারী (ক.)

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম,
তাসাউফ ও সূফিবাদ মূলত ইসলামের অন্তর্নিহিত আত্নিক দিক। তাসাউফ হল ইসলামের আধ্যাত্মিকতার প্রাণকেন্দ্র। ইসলাম কেবল বাহ্যিক কিছু বিধান ও ইবাদাত বন্দেগীর নাম নয়, বরং এর ভিতরে বিদ্যমান আছে বিশাল এক রহস্যঘেরা আধ্যাত্মিক জগৎ যা মানুষকে মওলায়ে হাকিকির কোরবত তথা সিরাতুল মোস্তাকিমে চলার দিক নির্দেশনা দান করে। আর সেই দিক নির্দেশনার নামই হল তাসাউফ। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে তাসাউফ শব্দের সরাসরি ব্যাবহার না থাকলেও এমন কিছু শব্দের অস্তিত্ব আছে যা তাসাউফ তথা আধ্যাত্মিকতার দিকে দালালত করে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনুল কারিমে ইরশাদ করেছেন, {قد افلح من تزكى} অর্থাৎ, সেই সফলকাম হল যে আত্নাকে পবিত্র করল। [সূরা আল আ’লা]। আলোচ্য আয়াতে ‘তাজাক্কা’ শব্দের অর্থ হল অন্তরের পরিশুদ্ধতা। অধিকাংশ মুফাসসিরগণ এই শব্দ দ্বারা তাসাউফকেই উদ্দেশ্য নিয়েছেন।

হাদীসের মধ্যেও তাসাউফ শব্দের সরাসরি ব্যাবহার লক্ষ্য করা যায় না। তবে রসূল ﷺ এর সমগ্র জীবন ছিল তাসাউফ তথা আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে আত্নাকে পবিত্র করার এক অনন্য মডেল। যেমন হযরত জিবরাইল (আঃ) একদা রসূল ﷺ এর নিকট এহসান সম্পর্কে জানতে চাইলে রসূল ﷺ ইরশাদ করেন “এহসান হল তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদাত কর যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ। আর যদি তুমি আল্লাহকে না দেখ তবে এটা জেনে রেখ যে, অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা তোমাকে দেখছেন”। উক্ত হাদিসে উল্লেখিত এহসান(আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব) শব্দকে হাদিস বিশারদগণ তাসাউফ উদ্দেশ্য নিয়েছেন। (মিরকাতুল মাফাতিহ)। এহসান তথা তাসাউফ হল সেই আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব যার দ্বারা বান্দা সর্বদা রেজায়ে এলাহী অর্জনে মগ্ন থাকে। একারণেই রসূল ﷺ আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্বকে এহসান বলে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাসাউফ শব্দটির মূল উৎস ‘সূফ’ তথা পশমি কাপড়। কারণ সূফি সাধকেরা বিলাসবহুল জীবন পরিত্যাগ করে পশমি কাপড় পরিধান করতেন। আবার কতিপয় উলামায়ে কেরাম মনে করে থাকেন তাসাউফ শব্দটি ‘সাফা’ তথা পবিত্রতা থেকে এসেছে। যে ব্যাখ্যায় নেয়া হোক না কেন মূলত তাসাউফ হল মহান আল্লাহর প্রেম ভক্তি সহকারে আত্নশুদ্ধি ও সাধনার মাধ্যমে মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌছানোর পদ্ধতি। তাসাউফের মৌলিকতা হল দুনিয়াবি সমস্ত লোভ লালসা, কলুষতা ইত্যাদি থেকে বিরত থেকে অন্তর তথা কলবকে পবিত্র রেখে রেজায়ে এলাহী তথা মওলায়ে হাকিকির কোরবত নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা। এই সম্পর্কে ইরানের বিখ্যাত কবি হাফিজ বলেছেন:
‘প্রথমে নিজে পুত-পবিত্র হও,
অতঃপর ঐ পবিত্রের উপর দৃষ্টিপাত কর’ [দিওয়ানে হাফিজ]।

যারা তাসাউফের উচ্চজ্ঞান হাসিল করে পার্থিব জীবনের সমস্ত কিছুকে ত্যাগ করে কলবকে পরিস্কার পবিত্র তথা কলবে সলিম এর মাধ্যমে আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব হাসিল করেছেন এই ধরণের মহান ব্যাক্তিত্বদের বলা হয় সূফি। সূফিদের কে আহলুল্লাহ তথা আল্লাহর বন্ধু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। সূফি হলেন ঐসকল ব্যাক্তি যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা নিজের জন্য নির্বাচিত করেছেন, যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা নিজের ভালোবাসা ‘ছাফা’ তথা পবিত্রতা দান করেছেন। সূফিগণ সর্বদা দুনিয়াকে ত্যাগকরে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যাস্ত থাকেন, আর পথহারা মানুষদেরকেও দিয়ে থাকেন আল্লাহর পথ তথা সিরাতুল মোস্তাকিমের পথচলার নির্দেশনা। নিজেকে আল্লাহর পথে পরিচালিত করতে হলে নিজেকে আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত রহমত প্রাপ্ত বান্দা তথা সূফি অলি আউলিয়ার ছোহবত গ্রহণ করতে হবে। মওলানা জালাল উদ্দিন রুমি (রহঃ) বলেন: “তুমি যত কঠিন প্রস্তরতুল্য হওনা কেন ছাহেবেদিল কামেল ওলীর ছোহবত তোমাকে মুক্তার ন্য্যয় উজ্জ্বল করে তুলবে”। [মসনবী শরীফ] সূফিদের ছোহবত গ্রহণের ব্যাপারে শাফেয়ী মাজহাবের ইমাম হযরতর শাফেয়ী (রহঃ) বলেন:“আমি সূফিদের ছোহবতে ছিলাম। তাদের সাথে থেকে দুইটি বিষয় আমি শিখেছি, একটি সময়ের মূল্য অর্থাৎ সূফি অনর্থক কোন সময়কেই ব্যয় করেন না, অপরটি হল অন্তরের প্রশান্তি তথা আত্নার পরিশুদ্ধতা”। [হিলয়াতুল আউলিয়া]।

যুগে যুগে অসংখ্য আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাগণ এই দুনিয়ার বুকে তশরিফ এনে পথহারা মানুষকে সিরাতুল মোস্তাকিমের দিশা দান করেছেন। সেই দিশার নাম হল ত্বরিকত বা রাস্তা। বর্তমান বিশ্বে সর্বাধিক সমাদৃত ত্বরিকার মধ্যে হযরত গাউছুল আজম আবদুল কাদের জীলানি (কঃ) প্রবর্তিত ‘কাদেরীয়া ত্বরিকা’। হযরত বাহাউদ্দীন নক্সবন্দী(রহঃ) কতৃক প্রবর্তিত নক্সবন্দীয়া ত্বরিকা। হযরত আবু ইসহাক শামী(রহঃ) প্রবর্তিত চিশতিয়া ত্বরিকা। এছাড়াও সোহরাওয়ার্দীয়া ত্বরিকা, কালন্দরীয়া ত্বরিকা, রাজ্জাকিয়া ত্বরিকা সহ আরো বহু ত্বরিকা রয়েছে। হযরত গাউছুল আজম মওলানা ছৈয়দ আহমদ উল্লাহ(কঃ) কতৃক প্রবর্তিত ‘ত্বরিকায়ে মাইজভান্ডারিয়া’ হল সমগ্র ত্বরিকতের নির্যাস,যা সমগ্র বিশ্বব্যাপি খ্যাতি লাভ করেছে। এই ত্বরিকতের দ্বিতীয় মহান ব্যাক্তিত্ব অন্যতম সফল প্রচারক হলেন হযরত গাউছুল আজম মাইজভান্ডারি (কঃ) কেবলার আপন ভাতিজা গাউছুল আজম কুতুবুল আকতাব ফানা ফিল্লাহ হযরত মওলানা ছৈয়দ গোলামুর রহমান মাইজভান্ডারি (কঃ) প্রকাশ বাবা ভান্ডারী কেবলা। বাবা ভান্ডারী কেবলা ছিলেন মাদারজাত ওলী এবং হযরত গাউছুল আজম মাইজভান্ডারি (কঃ) হযরত কেবলার রুহানী খেলাফত প্রাপ্ত স্নেহধন্য ওলী।

বাবা ভান্ডারী কেবলার দুনিয়ায় আগমনের পূর্বেই হযরত কেবলা তাঁর বেলাদতের বেশারত প্রদান করেছিলেন। বাবা ভান্ডারী (কঃ)’র আকিকার দিবসে হযরত কেবলা বাবা ভান্ডারী কে কোলে নিয়ে কালাম করেছিলেন: “এই শিশু আমার বাগানের গোলাপ ফুল। হযরত ইউসুফ (আঃ) এর রুপ লাবন্য তাঁর মাঝে আসিয়াছে। তাহাকে যত্ন করিও। আমি তাঁহার নাম গোলামুর রহমান রাখিলাম”। ছোটবেলা থেকেই হযরত কেবলা কাবার ছোহবতই ছিল বাবা ভান্ডারীর সব চাইতে প্রিয় বিষয়। হযরত কেবলার বেলায়তের মহাসমুদ্রে নিজের অস্তিত্বকে করে দিয়েছিলেন বিলীন। শিক্ষা জীবনে জামায়তে উলার ফাইনাল পরীক্ষা অসমাপ্ত রেখে হযরত কেবলার আধ্যাত্মিক ইশারায় ফিরে আসেন।

হযরত কেবলার ছোহবতে থেকেই শুরু করেন সিরাতুল মোস্তাকিম তথা মহা প্রভুর নৈকট্যপ্রাপ্তির পথে যাত্রা। বাবা ভান্ডারী কেবলা প্রায় সময় জজবা হালতে থাকতেন। বাবা ভান্ডারী কেবলার রেয়াজত তথা আধ্যাত্মিক সাধনা বর্ণনার বাইরে। পার্বত্য চট্টগ্রামের গহীন অরণ্যে, পাহাড়ে পর্বতে, দুর্গম স্থানে, প্রচন্ড শীতে, তীব্রদাপদাহে, নিভৃতে নিশীতে একাকি ভ্রমণ করে বেরিয়েছেন। এক আল্লাহর প্রেমে মগ্ন হয়ে ধ্যানে ছিলেন দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। বাবা ভান্ডারী খোদার প্রেমে এতটাই ধ্যানমগ্ন থাকতেন যে দুনিয়াবি চিন্তাধারা তাঁর কাছেও ঘেষতনা। মহান রবের প্রেমে বিভোর হয়ে ও হযরত কেবলার প্রেমে আত্নবিলীন করে দিয়ে ‘ফানা’ ও ‘বাকা’ সম্পূর্ণভাবে হাসিল করে কামালিয়তের উচ্চ মকামে অবস্থান করেছিলেন। বাবা ভান্ডারী ছিলেন খিজরি মকাম তথা খোদায়ী রহস্যপূর্ণ অবস্থানের ওলী। খোদায়ী রাজ রহস্যের সর্বোচ্চ স্থানে ছিল বাবা ভান্ডারী কেবলার বিচরণ। হযরত কেবলার প্রবর্তিত ত্বরিকতের ধ্যান, হাল, জজবা ইত্যাদিকে করে নিয়েছিলেন নিজের পরম আপন। জজবার সময় বাবা ভান্ডারী খোদায়ী ধ্যানে এতটাই মগ্ন থাকতেন যে পার্থিব বিষয় চিন্তাধারা তাঁর নজরেই আসত না।

বাবা ভান্ডারী কেবলার জজবার রহস্য সম্পর্কে হযরত কেবলা (কঃ) কালাম করেন: “উহ ছাহেবে জালাল হ্যায়, মূলকে এয়ামন মে রাহতা হ্যায়, আলমে আরওয়াহ মে ছায়ের করতা হ্যায়। বাবা ভান্ডারী কেবলা কারো নিকট ছিলেন আল্লাহর একজন মহান ওলী, কারো নিকট ছিলেন মহা প্রভুর রাজ রহস্যের ভান্ডার, আর কারো নিকট ছিলেন আল্লাহর দয়া রহমত পাওয়ার আশ্রয়স্থল। ভক্তগণ তাঁকে ‘রহমান মওলা’ ‘বাবাজান কেবলা’ ‘বড় মওলানা’ ‘বাবা ভান্ডারী’ প্রভৃতি নামে স্মরণ করেন। বাবা ভান্ডারী কেবলা এমন আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব সম্পন্ন ওলী ছিলেন যিনি চাওয়ামাত্রই একজন সাধারণ ব্যাক্তিকেও আল্লাহর ওলী বানিয়ে দিতেন। বাবা ভান্ডারী ভক্ত মাইজভান্ডারি মরমি সাধক রমেশ ফকির বলেন-
‘দেখলে ছবি পাগল হবি ঘরে রইতে পারবিনা
আঠার আলমে আমার বাবা মওলানা।’

বাবা ভান্ডারী কেবলা হযরত গাউছুল আজম মাইজভান্ডারি (কঃ) কতৃক পরিস্ফুটিত এক মহান সৌরভময় গোলাপ ছিলেন। বাবা ভান্ডারী কেবলার কার্যাদি ছিল সর্বসাধারণের চিন্তা ভাবনার উর্ধে। বাবা ভান্ডারীর এক মুহূর্তের দয়ার নজরে চরম পাপী ব্যাক্তিও পরম সূফিতে পরিণত হয়ে যায়। রমেশ ফকির আরো বলেন-
‘এক নজরে হেরে যারে, দিলের পর্দা যায় তার ছিরে
এলমে লদুন জারি করে চোখের ইশারায়।’

বাবা ভান্ডারী কেবলা হযরত গাউছুল আজম মাইজভান্ডারি কেবলার বেলায়তের বাগানে সর্বকালে অতুলনীয় বে-মেছাল অবস্থানে থেকে ভক্ত আশেকীনদের অন্তরের সর্বোচ্চ মকানে থেকে ‘মওলায়ে রহমান’ নামে চিরমহিমান্বিত হয়ে আছেন থাকবেন। বাবা ভান্ডারী কেবলাকে নিয়ে লিখা সম্ভব নয়। কারণ তাঁর আধ্যাত্মিক সাধণা, রেয়াজত, কারামত কোন কিছুই এই ক্ষুদ্র জ্ঞানসম্পন্ন মস্তিষ্কে ধারণ করা, কলম দ্বারা লিখা সম্ভব নয়। অনন্তকাল এই লিখা চললেও হযরত কেবলা (কঃ) ও বাবা ভান্ডারী কেবলা (কঃ) এর শান আজমতের বিন্দুমাত্র তুলে ধরা সম্ভব নয়। আধ্যাত্মিক জগতের এই দুই মহান নক্ষত্র হযরত গাউছুল আজম মাইজভান্ডারি (কঃ) ও হযরত বাবা ভান্ডারী কেবলা (কঃ)’র ফুয়্যুজাত, দয়ার ভিক্ষা পাওয়ার আশায় মহান ২৯শে আশ্বিন হযরত গাউছুল আজম বাবা ভান্ডারী কেবলার মহান খোশরোজ মোবারক উপলক্ষে আমি অধমের এই ক্ষুদ্র নিবেদন।

লেখক: নায়েবে মোন্তাজেম, দরবারে কামালিয়া শরীফ

আরও পড়ুন