২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইসলামী ব্যাংকে কি হচ্ছে এসব!

গতকাল ৯ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে যে উত্তপ্ত আলোচনা হলো, সেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও চোখ খোলার মতো বক্তব্য রেখেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

বিরোধী দলীয় নেতা ও জামাতের আমির শফিকুর রহমান যখন দাবি করলেন যে, ‘সরকার বিতর্কিত লোক বসিয়ে ব্যাংক লুটপাট করছে’, তখন তার এই রাজনৈতিক যাতনার বিপরীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী সংসদে যে তথ্য ও জবাব দিয়েছেন, তা দেশের প্রতিটি নাগরিকের জানা উচিত।

আমরা ব্যাংকে কোনো ধরনের রাজনীতিকরণ বা লুটপাট চাই না। ইতিহাস সাক্ষী, ২০১৭ সালে বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এস আলম গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ মিলে এই ইসলামী ব্যাংকটিকে গায়ের জোরে কব্জা করে সম্পূর্ণ তছনছ করে দিয়েছিল। বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ব্যাংকটিকে প্রায় দেউলিয়া করে দেওয়া হয়েছিল। সেই ক্ষত কাটতে না কাটতেই ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকটি এখন আরেকটি রাজনৈতিক দলের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এক লুণ্ঠনকারীর হাত থেকে মুক্ত হয়ে ব্যাংকটি এখন আরেক দলের দখলের রাজনীতিতে পড়েছে।

সংসদে দাঁড়িয়ে বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান অবশ্য সরকারকে একটি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন। তিনি সাফ বলেছেন, “ইসলামী ব্যাংক নিয়ে যদি সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা তথ্যপ্রমাণ থাকে, তবে তা শ্বেতপত্র (White Paper) আকারে প্রকাশ করা হোক।” তিনি দাবি করেন, কোনো প্রমাণ ছাড়াই ঢালাওভাবে ব্যাংকটিকে ‘জামায়াতীকরণ’-এর তকমা দিয়ে আসলে এক দলীয় দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।

জামাত আমিরের এই শ্বেতপত্র প্রকাশের চ্যালেঞ্জের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে যে পরিসংখ্যান ও তথ্য দিলেন, তা এককথায় ভয়াবহ…

তিনি জানান, ৫ আগস্টের পর কোনো আইন-কানুন না মেনে গায়ের জোরে ইসলামী ব্যাংক থেকে ৯,০০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে! আইন ভঙ্গ করে তাদের জায়গায় ৬,০০০ নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের প্রায় সবাই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের (জামাত সমর্থক)। নিয়ম ভেঙে, কোনো যোগ্যতা ছাড়াই অনেককে ৩টি করে প্রমোশন দিয়ে রাতারাতি মোট ১৩,০০০ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে!

সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় ছিল ইসলাম ও জামাতকে নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সেই রাজনৈতিক রসিকতা ও কটাক্ষ। জামাত আমিরের বক্তব্যের জবাবে তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে সটান বলে দিয়েছেন- ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, আর জামাতে ইসলামও ইসলাম নয়।

ধর্মের নামে ব্যাংক দখল করা এবং সাধারণ মানুষের আমানতের টাকা নিয়ে রাজনীতি করা যে কত বড় ভণ্ডামি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই একটি বাক্যেই তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। সিএসআর (CSR)-এর নাম করে ব্যাংকের টাকায় বিমানের টিকিট কাটা আর হেড অফিসের অনুমতি ছাড়া নিজেদের লোকদের কোটি কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার ইতিহাসও তিনি সংসদে টেনে এনেছেন।

এর জবাবে অর্থমন্ত্রীও স্পষ্ট করেছেন যে, ব্যাংকটি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা দলের পৈতৃক সম্পত্তি নয়। গ্রাহকদের আমানত রক্ষা এবং খেলাপি ঋণ ঠেকানোর জন্যই সরকার সেখানে আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে, একে ‘দখল’ বলা চলে না।

ইসলামী ব্যাংক একটি রাষ্ট্রীয় ও পাবলিক ব্যাংক, যেখানে কোটি কোটি সাধারণ মানুষের রক্ত জল করা আমানত রয়েছে। ২০১৭ সালে এক দল লুটপাট করেছে, ২০২৪-এর পর আরেক দল আধিপত্য দেখাচ্ছে- এই চক্র বন্ধ হওয়া দরকার।

ব্যাংকটির সংস্কার বা সুশাসনে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ থাকলেই জামাতের এত মাথা ব্যথা বা গাত্রদাহ কেন? এটা কি তাদের দলীয় সম্পত্তি?

জনগণের টাকায় চলা এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও পরিচালনা হওয়া উচিত মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে, কোনো দলের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য নয়। ইসলামী ব্যাংককে এস আলম বা জামাত- যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিস্বার্থের প্রভাবমুক্ত করে সাধারণ গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানাচ্ছি। (লিখাটি আনিস আলমগীরের ফেইসবুক ওয়াল থেকে নেয়া)

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

আরও পড়ুন