২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এমপি–ইউএনও–পিআইও’র সমন্বয়হীনতায় কর্ণফুলীতে খাল খনন থমকে, ফেরত যাচ্ছে দেড় কোটি টাকা!

এমপি–ইউএনও–পিআইও'র

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে নেওয়া খাল পুনঃখনন প্রকল্পে পরিকল্পনাহীনতা, সমন্বয় ঘাটতি ও দায়িত্ব অবহেলার কারণে উন্নয়নের প্রায় দেড় কোটিরও বেশি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি আর মাত্র দুই দিন পরেই বরাদ্দের এ টাকা লেফট হয়ে যাবে।

জানা গেছে, ‘অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান (ইজিপিপি)’ প্রকল্পের আওতায় কর্ণফুলী উপজেলায় শিকলবাহা ও খোয়াজনগর খাল পুনঃখনন কাজ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হচ্ছে—ফলে, বরাদ্দের বড় অংশ ফেরত যাচ্ছে। স্থানীয়রা বলেছেন, এস্কেভেটর কিংবা ভেকু মেশিনের পরিবর্তে শ্রমিক দিয়ে কাজ করলে সহজে খালে প্রবেশ করে পুনঃখনন করা যেতো।

যদিও কর্ণফুলী উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা (পিআইও) খালের সংকীর্ণতা দেখিয়ে খননযন্ত্র (এস্কেভেটর) প্রবেশ করানো সম্ভব না হওয়াকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেও স্থানীয়দের প্রশ্ন—প্রকল্পটি শুরু থেকেই সঠিক পরিকল্পনায় বাস্তবায়ন করা হয়নি। তাই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যে সব খালে খনন যন্ত্রসহ শ্রমিকরা প্রবেশ করে কাজ করা যেত, সে সব খালে প্রকল্প নেওয়া হয়নি।

এদিকে একই সংসদীয় আসনের আওতাধীন আনোয়ারা উপজেলায় অনুরূপ প্রকল্পে হতদরিদ্র শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করে কাজ চলমান রয়েছে। এখনো কোনো অর্থ ফেরত যায়নি বলে জানিয়েছেন আনোয়ারা উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা (পিআইও) উমা খাঁন কাফি। কর্ণফুলীর ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—কেন একই আসনের এমপি দুই উপজেলায় ভিন্ন ভিন্ন মনোযোগ দিলেন?

সচেতন মহলের অভিযোগ, অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থানের জন্য নেওয়া প্রকল্পে শ্রমিক নিয়োগের পরিবর্তে যন্ত্রনির্ভর কাজের সিদ্ধান্ত প্রকল্প বাস্তবায়নকে জটিল করে তুলেছে। ফলে কাজও শেষ হয়নি, আবার সরকারি অর্থ ফেরত যাওয়ার পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, খালগুলোতে ভেকু প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা থাকলেও নারী–পুরুষ শ্রমিক ব্যবহার করে পুনঃখননের কাজ চালানো সম্ভব ছিল। একই সংসদীয় আসনের আনোয়ারা উপজেলায় শ্রমিকের অংশগ্রহণে কাজ চলমান থাকলেও কর্ণফুলীতে কেন ভিন্ন পদ্ধতি নেওয়া হলো—এ প্রশ্নও উঠছে।

এ নিয়ে স্থানীয়দের একাংশের প্রশ্ন, চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা–কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম এবং কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সজীব কান্তি রুদ্র, প্রকল্প কর্মকর্তা (পিআইও) সুজন কান্তি দাশ প্রকল্প বাস্তবায়নে কতটা কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন? প্রকল্প উদ্বোধন, সময়মতো কাজ শুরু এবং তদারকির ঘাটতি ছিল কিনা—এসব প্রশ্নেরও স্পষ্ট জবাব মিলছে না।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে কর্ণফুলীর শিকলবাহা ও খোয়াজনগর খালের প্রায় ৮ কিলোমিটার পুনঃখননে ২ কোটি ৬ লাখ টাকার বেশি বরাদ্দ আসে। নীতিমালা অনুযায়ী অতিদরিদ্র নারী–পুরুষ শ্রমিক নিয়োগের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও সরেজমিনে শ্রমিকের পরিবর্তে ভেকু দিয়ে খনন কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, খাল খননের নামে কোথাও কোথাও গাছ কাটা, ঝোপঝাড় পরিষ্কার ও আংশিক মাটি কাটার কাজ হলেও অধিকাংশ এলাকায় কার্যকর পুনঃখননের দৃশ্য নেই। কোথাও সীমানাপ্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, শিকলবাহা খাল এলাকায় প্রকল্পের একটি সাইনবোর্ড। তাঁতে লিখা- অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি)-এর আওতায় ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে ৩ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের তথ্য উল্লেখ রয়েছে। সাইনবোর্ড অনুযায়ী, এ প্রকল্পে ৭৭ লাখ ২৮ হাজার ৮৪২ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে উপকারভোগীদের মজুরি বাবদ প্রায় ৩৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকা এবং ‘নন-ওয়েজ কস্ট’ বাবদ প্রায় ৩৮ লাখ ৮৭ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এছাড়া ১৭৮ জন উপকারভোগী, দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি ও ৪০ কর্মদিবসের তথ্য উল্লেখ থাকলেও কাজ শেষের নির্দিষ্ট তারিখ সাইনবোর্ডে উল্লেখ পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা দাবি করেন, এ সংখ্যক শ্রমিক কখনো কাজ করেননি। এসব কেন লাগিয়েছে তাঁরা জানেন না।

এদিকে প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে করা একটি চুক্তিনামা, যা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চুক্তিতে প্রথম পক্ষ হিসেবে কর্ণফুলী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির নাম রয়েছে। দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে শিকলবাহা ইউনিয়নের মোহাম্মদ জাফর ও মো. ইব্রাহিমের নাম। তবে তাঁদের কোনো পদবি উল্লেখ নেই। স্থানীয়দের কেউ কেউ তাঁদের রাজনৈতিকভাবে বিএনপি-সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করলেও বিষয়টি স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

চুক্তিপত্রের শর্ত অনুযায়ী, এস্কেভেটর (ভেকু) দিয়ে ঘণ্টাভিত্তিক খাল খননের কাজ পরিচালনার কথা বলা হয়েছে, যেখানে প্রতি ঘণ্টায় ২৬০০ টাকা হারে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া জ্বালানি খরচ দ্বিতীয় পক্ষ বহন করবে বলে উল্লেখ রয়েছে।

চুক্তিতে ২০২৬ সালের ২৫ মে’র মধ্যে ৩.২ কিলোমিটার শিকলবাহা খাল পুনঃখনন সম্পন্ন করার শর্ত রাখা হয়। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে দায়ভার দ্বিতীয় পক্ষকে নিতে হবে এবং প্রয়োজনে নিজ খরচে কাজ সম্পন্ন করতে হবে বলেও উল্লেখ রয়েছে।

চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনে একাধিক এস্কেভেটর ব্যবহার করতে পারবে এবং সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত কাজ চলবে। দুপুরে এক ঘণ্টা বিরতি, প্রতিদিন কাজ শেষে ঘণ্টাভিত্তিক বিল পরিশোধ এবং যান্ত্রিক বা পক্ষীয় কারণে কাজ বন্ধ থাকলে বিল না দেওয়ার শর্তও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তবে চুক্তির বাস্তবায়ন কাঠামো ও প্রকল্প সাইনবোর্ডে উল্লেখিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধান অনুযায়ী, চুক্তিতে ৩.২ কিলোমিটার কাজের কথা বলা হলেও প্রকল্প সাইনবোর্ডে ৩ কিলোমিটার খালের উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে হিসাব বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভিন্ন ভিন্ন তথ্য অনুযায়ী খাল খনন ব্যয় ও সময়সীমা নিয়ে অসামঞ্জস্য রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়ের অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের নিষ্ক্রিয়তায় উন্নয়নকাজ অনেকটা ‘লেজেগোবরে’ অবস্থায় পড়েছে। বিশেষ করে এমপি ও উপজেলা প্রশাসনের কার্যকর তদারকি ছিল কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কর্ণফুলী উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা (পিআইও) সুজন কান্তি দাশ বলেন, ‘শিকলবাহা ও খোয়াজনগর খাল পুনঃখননে প্রায় ৮ কিলোমিটার কাজের জন্য ২ কোটি ৬ লাখ টাকার বরাদ্দ ছিল। তবে খোয়াজনগর খালে জোয়ার–ভাটার প্রভাব ও পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় এস্কেভেটর প্রবেশ করানো সম্ভব হয়নি, ফলে কাজ সম্পন্ন করা যায়নি।’

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ প্রকল্পে খোয়াজনগর খালে মাত্র ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে এবং বাকি প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত যাচ্ছে। তিনি আরও জানান, শিকলবাহা খাল পুনঃখননে ৭৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা বরাদ্দের মধ্যে প্রায় ৩৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে, অবশিষ্ট প্রায় ৪৪ লাখ টাকা ফেরত যাবে। তাঁর দাবি, নানা সীমাবদ্ধতায় নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে আনোয়ারা উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা (পিআইও) উমা খান কাফি জানান, ‘তাঁদের উপজেলায় একই ধরনের দুটি খাল পুনঃখনন প্রকল্পে প্রায় দুই কোটি টাকার বরাদ্দ এসেছে এবং কাজ চলমান রয়েছে। তাঁর দাবি, সেখানে কাজ উদ্বোধনের পর থেকেই বাস্তবায়ন কার্যক্রম অব্যাহত আছে এবং এখন পর্যন্ত অর্থ ফেরতের কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।’

তিনি আরও জানান, ‘প্রকল্প নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত ৪৩ দিনের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার নিয়ম থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী শ্রমিক ও যন্ত্রের সমন্বয়ে কাজ করা হচ্ছে। কাজ শুরুর ৪৩ দিন পর্যন্ত টানা কাজ চলবে। খাল খনন কাজের উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য।’

এ বিষয়ে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সজীব কান্তি রুদ্র বলেন, “বরাদ্দের অর্থ স্থায়ীভাবে ফেরত যাচ্ছে তা না। ২২ জুনের মধ্যে অর্থ ট্রেজারিতে জমা দিতে হবে। জুন ক্লোজিংয়ের পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে অর্থ পুনরায় বরাদ্দ হিসেবে পাওয়া যাবে।” অথচ পিআইও স্পষ্ট করে বলেছেন, অর্থ ফেরত যাচ্ছে। অন্যদিকে, সঠিক সময়ে আনোয়ারা উপজেলা কাজ শুরু করতে পারলে কর্ণফুলী উপজেলা পারেনি কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তাঁদের কোন সদুত্তরও মিলেনি।

অপরদিকে, স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, “খাল খননের জন্য সাধারণত এত বড় অঙ্কের বরাদ্দ আসে না। ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার প্রকল্প হয়ে থাকে। দুই কোটির বেশি বরাদ্দ এসেছে কি না, তা আমার জানা নেই। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখব এবং কেন বরাদ্দের অর্থ ফেরত যাচ্ছে, তা সংশ্লিষ্টদের কাছে জানতে চাইব।”

ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, কারণ স্থানীয় সংসদ সদস্য নিজেই জানিয়েছেন, কর্ণফুলীর দুটি খাল পুনঃখনন প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ এসেছে সে বিষয়ে তিনি অবগত নন। অথচ উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিকলবাহা ও খোয়াজনগর খালের প্রায় ৮ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজে ২ কোটি ৬ লাখ টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির আওতায় বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পে কেন এমন সমন্বয়হীনতা, অনিয়ম এবং সরকারি অর্থ ফেরত যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলো? প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থতার দায় কার—সংসদ সদস্য, ইউএনও, পিআইও নাকি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের? নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার কারণ কী এবং বিকল্প কোনো পদ্ধতিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ ছিল কি না—এসব প্রশ্নেরও সুস্পষ্ট উত্তর মেলেনি।

আরও পড়ুন