দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীতে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে প্রতিমা বিসর্জন উৎসব যেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মিলনে রূপ নেয়। বিসর্জনে সনাতনীদের পাশাপাশি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মিলে লাখো মানুষের সরব উপস্থিতি ঘটেছে সৈকততীরে। সৈকতের লাবণী পয়েন্টের উত্তর-দক্ষিণ এলাকাজুড়ে শুধু মানুষ আর মানুষ। একে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মহামিলন বলে উল্লেখ করেছেন উপস্থিত লোকজন।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকালে সৈকতের লাবণী পয়েন্টে প্রতিমা বিসর্জন উৎসবে দেবী মা-কে শেষ বিদায় জানাতে পর্যটকসহ লাখো মানুষের উপস্থিতি হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন কক্সবাজার সদর উপজেলা পুজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট বাপ্পী শর্মা।
বিসর্জন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিন বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান কথা আর কাজে মিল রেখে চলছেন। দেশের ইতিহাসের প্রথম পূজার মহানবমীতে ঢাকার বাইরে রাজশাহী, চট্টগ্রামের মন্ডপে গিয়ে পূজার্থীদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। অন্য সময়ের চেয়ে পূজার বরাদ্দ এবং ছুটি বাড়িয়ে সনাতনীদের দীর্ঘদিনের দাবিও মিটিয়েছেন তিনি। নির্বাচনী ইশতেহারে রেইনবো জাতি গঠনের যেই প্রতিশ্রুতি- সেই পথেই হাটছে সরকার। সবার আগে বাংলাদেশ, সেটাই বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতায় আমরা এগিয়ে যেতে চাই। আজকের সমুদ্র পারের এ মিলন প্রমাণ করছে- আমরা অসাম্প্রদায়িতক চেতনায় দেশ স্বাধীন করেছিলাম, এখনো সেই ধারায় রয়েছি।
আয়োজকরা জানান, প্রতিবছর বিজয়া দশমীতে দেবী দুর্গার বিসর্জন উপলক্ষে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ কক্সবাজার সৈকতে লাখো মানুষের মিলন ঘটে। এবছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। লাখো মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠে সৈকতের বেলাভূমি।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের অর্থ সম্পাদক স্বপন গুহ জানান, শুধু লাবণী পয়েন্টেই বিভিন্ন উপজেলা থেকে এবারে আসা প্রায় অর্ধশতাধিক প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়েছে। লামা, নাইক্যংছড়ি, উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকেও বিসর্জনে প্রতিমা লাবণী পয়েন্টে আসে। এছাড়া একই সময়ে রামুর বাঁকখাল নদী, চকরিয়ার মাতামুহুরী, টেকনাফের সাগর ও নাফনদী, উখিয়ার ইনানী সৈকত ও রেজুনদীতে প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়।
জেলা পুজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক স্বপন দাশ বলেন, বুধবার দুপুরের পর হতে বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে সৈকতের লাবণী পয়েন্টের উন্মুক্ত মঞ্চের সামনে আনা হয় প্রতিমা। বেলা দু’টায় শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তিনটায় প্রতিমা মঞ্চে এলে শুরু হয় বিজয়া সম্মেলন। উদয় শংকর পাল মিঠুর সভাপতিত্বে এতে ভুম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন, কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা ও সদর আসনের এমপি লুৎফুর রহমান কাজল, জেলা বিএনপির সভাপতি ও কক্সবাজার-৪ আসনের এমপি শাহজাহান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক ও নারী সাংসদ অ্যাডভোকেট শামিম আরা স্বপ্না, জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান, পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান, ট্যুুরিস্ট পুলিশের এসপি নিশাত এঞ্জেলা, অধ্যাপক সোমেশ্বর চক্রবর্তী, দুলাল চক্রবর্তী, জেলা যুবদল সাধারণ সম্পাদক জিসান, ছাত্রদল সভাপতি ফাহিমুর রহমান ফাহিম, পূজা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাবুল শর্মা, জেলা শ্রমিকদল সভাপতি রফিকুল ইসলাম, সদর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট বাপপী শর্মা, সাধারণ সম্পাদক বলরাম দাশ অনুপম, পৌর সভাপতি তপন দাশ,সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) সুজন শর্মা প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
সাড়ে ৩টায় শুরু হওয়া আলোচনা সভা ৫টায় শেষ হয়। বিকাল ৫টায় বিসর্জন মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে সোয়া ৫টায় বিসর্জন বিসর্জন শুরু হয়। পূজা ও বিসর্জন নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসন পূর্বের মতো কয়েকস্তরের নিরাপত্তাবলয় গড়ে তুলে। বাড়তি নিরাপত্তা হিসেবে সাদা পোষাকে শৃংখলাবাহিনীর সদস্যরা মোঢ়ে মোঢ়ে দায়িত্বপালন করে। সাগরে তীরের কাছাকাছি বোটটহলও উৎসবকে অর্থবহ করে তুলে।
জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠু বলেন, জেলায় এবারে ৩২৪টি মণ্ডপে সুষ্ঠু পরিবেশে পূজা সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে ১৫৫টি প্রতিমা ও ১৬৯টি ঘটপূজা ছিল। সৈকতে প্রতিমা বিসর্জনে দেশের সর্ববৃহৎ উৎসব শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন করার মাধ্যমে এবারও আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি, কক্সবাজার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য স্থান।
রামু থানার ওসি একে ফজলুল হক বলেন, রামু থেকে কড়া নিরাপত্তায় নাইক্ষ্যংছড়িসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি প্রতিমা বিসর্জনের জন্য কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে যায়। বাকি গুলো বাঁকখালী নদীতে বিসর্জন দেয়া হয়েছে। ওখানেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্তক অবস্থানে ছিল।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিওনের পুলিশ সুপার নিশাদ এঞ্জেলা বলেন, দুর্গাপূজার ছুটি শুরুর দিন থেকে কক্সবাজারে বিপুল পরিমাণ পর্যটক ও দর্শনার্থী এসেছেন। সপ্তাহিক মিলে আরো তিনদিন ছুটি রয়েছে। টানা পাঁচদিন পর্যটকে সরগরম থাকবে সৈকত এলাকা। বিজয়া দশমীকে প্রতিমা বিসর্জনে পূজার্থী ও দর্শণার্থী মিলে লাখো মানুষের উপস্থিতি ঘটে। আগে থেকেই নিরাপত্তার সকল কিছু সম্পন্ন করা ছিল। আমাদের সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে এসআরবিসহ শৃংখলা বাহিনীর নানা বিভাগের সদস্যরা।
ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেবদূত মজুমদার বলেন, যানজট নিরসনে শহরের বাইরের উপজেলাগুলোর পূজামণ্ডপের প্রতিমা কলাতলী ডলফিন মোড় হয়ে এবং শহরের অভ্যন্তরের প্রতিমাগুলো প্রধান সড়কের হলিডে মোড় হয়ে সৈকতের লাবনী পয়েন্টের বিসর্জন স্থলে আনা হয়।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, আবহমান কাল থেকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশ- প্রতিমা বির্সজনে লাবণি পয়েন্ট আজকের দৃশ্য সেটা আবারো প্রমাণ করলো। প্রতিমাগুলো মণ্ডপ থেকে ট্রাকযোগে আনার সময় আনসার সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে। প্রতিমা বোঝাই ট্রাকবহরে যাতে অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য পুলিশের টহল দল তৎপর ছিল। সৈকতের প্রবেশমুখ, প্রতিমা বহনের সড়ক ও মোড়ে সাদাপোশাকে লোকজনের নজরদারি বাড়ানো হয়। কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া লাখো মানুষের মিলনে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন করতে পারায় আমরা সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, অতীতের মতো লাখো মানুষের উপস্থিতিতে দেশের বৃহৎ বিসর্জন উৎসব হয়েছে কক্সবাজার সৈকতে। পূজার্থীর পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ পর্যটক এবং স্থানীয় দর্শনার্থী অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সনাতনীদের এ আয়োজনে অংশ নেন। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন করতে পেরে আমরা আনন্দিত।














