যন্ত্রাংশ হিসেবে আমদানির আড়ালে দেশে এনে স্থানীয়ভাবে জোড়া লাগিয়ে (অ্যাসেম্বল) পূর্ণাঙ্গ বিলাসবহুল গাড়িতে রূপান্তরের অভিযোগে কক্সবাজারে তিনটি গাড়ি জব্দ করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডির)। জব্দ করা গাড়িগুলোর মধ্যে রয়েছে টয়োটা সুপার, হুন্ডা, সিভিক ও মাজদা এমএক্স-৫।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডির), চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালিত অভিযানে গাড়িগুলো জব্দ করা হয়। প্রাথমিকভাবে এসব গাড়ি যন্ত্রাংশ হিসেবে আমদানি করে দেশে এনে স্থানীয়ভাবে সংযোজনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ গাড়িতে রূপ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে পণ্যের প্রকৃতি ও শুল্কায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানির নামে পূর্ণাঙ্গ গাড়ির কাঠামো তৈরি করে বাজারজাত করা হলে তা রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও প্রচলিত আমদানি নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না— তা খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
অভিযান ও জব্দের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে একটি প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। এতে বক্তব্য দেন রেজভী আহম্মেদ, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অ্যাডিশনাল ডিজি), কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডির), চট্টগ্রাম।
যন্ত্রাংশ থেকে পূর্ণাঙ্গ গাড়ি
সিআইআইডির সূত্রে জানা গেছে, আমদানি করা গাড়ির যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে সংযোজন করে পূর্ণাঙ্গ গাড়িতে রূপান্তরের বিষয়টি গোয়েন্দা নজরদারিতে আসে। এরই ধারাবাহিকতায় কক্সবাজারে অভিযান চালিয়ে তিনটি গাড়ি জব্দ করা হয়।
জব্দ করা গাড়ির মধ্যে রয়েছে জনপ্রিয় স্পোর্টস কার টয়োটা সুপার, হুন্ডা, সিভিক ও মাজদা এমএক্স-৫। এসব গাড়ির প্রকৃত আমদানি পদ্ধতি, আমদানির সময় সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রে কী ধরনের পণ্য ঘোষণা করা হয়েছিল এবং দেশে আসার পর কীভাবে গাড়িগুলো সংযোজন করা হয়েছে- এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা সংস্থার অভিযানের ফলে প্রশ্ন উঠেছে, যন্ত্রাংশ আমদানির সুযোগ ব্যবহার করে কোনো চক্র পূর্ণাঙ্গ গাড়ি তৈরির মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি বা আমদানি-সংক্রান্ত বিধিবিধান এড়িয়ে যাচ্ছে কি না।
রাজস্ব ফাঁকির আশঙ্কা
গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ও করের পরিমাণ নির্ধারণে গাড়ির ধরন, ইঞ্জিনের সক্ষমতা, মূল্য এবং আমদানির প্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে একটি পূর্ণাঙ্গ গাড়ির পরিবর্তে তার বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আলাদাভাবে আমদানি করে দেশে সংযোজন করা হলে শুল্কায়ন ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের কার্যক্রমে প্রকৃত আমদানি তথ্য গোপন করা হয়েছে কি না, যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষিত পণ্য প্রকৃতপক্ষে কী ছিল এবং আমদানিকারকরা সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করেছেন কি না- এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
কক্সবাজারে নজরদারি জোরদার
কক্সবাজার দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা হওয়ায় সেখানে বিলাসবহুল ও উচ্চমূল্যের বিভিন্ন গাড়ির চলাচল রয়েছে। জব্দ হওয়া তিনটি গাড়ির ক্ষেত্রেও আমদানি, মালিকানা, নিবন্ধন এবং দেশে সংযোজনের প্রক্রিয়া যাচাই করা হচ্ছে।
সিআইআইডির এ অভিযানকে অবৈধ বা বিধিবহির্ভূত পন্থায় গাড়ি আমদানির বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের রাজস্ব সুরক্ষা এবং আমদানি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তদন্তে বেরিয়ে আসতে পারে আরও তথ্য
জব্দ করা গাড়িগুলোর আমদানি-সংক্রান্ত নথিপত্র, বিল অব এন্ট্রি, ঘোষিত পণ্যের বিবরণ, মূল্য, শুল্কায়ন এবং দেশে সংযোজনের সঙ্গে কারা জড়িত- এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে গাড়িগুলো কীভাবে দেশে এসেছে এবং যন্ত্রাংশ আমদানির ঘোষণার আড়ালে কোনো অনিয়ম করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
সিআইআইডির অতিরিক্ত মহাপরিচালক রেজভী আহম্মেদ জানান, জব্দ করা গাড়িগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও আমদানি প্রক্রিয়া যাচাই করে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
‘পার্টস’ আমদানির আড়ালে পূর্ণাঙ্গ গাড়ি- কক্সবাজারে তিনটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দের ঘটনা তাই শুধু গাড়ি আটকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর মাধ্যমে দেশের আমদানি ব্যবস্থায় ঘোষিত পণ্য, শুল্কায়ন ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো ফাঁকফোকর ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।














