চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার বড়উঠান ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার) মো. ফোরকানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সরকারি সেবা ও সনদ করে দেওয়ার কথা বলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জন্মনিবন্ধন, ভোটার নিবন্ধন, নাগরিক সনদ, মৃত্যু সনদ, ট্রেড লাইসেন্স ও ওয়ারিশ সনদসহ বিভিন্ন সেবা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে তিনি মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন।
অভিযুক্ত মো. ফোরকান বড়উঠান ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ফোরকান নিয়মিত নির্ধারিত সময়ে ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত থাকেন না। এমনকি পরিষদে এলেও সরকারি নির্ধারিত ইউনিফর্ম পরেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া ভোটার নিবন্ধন, জন্মনিবন্ধন ও ওয়ারিশ সনদসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়ার নামে আগেই টাকার অঙ্ক নির্ধারণ করে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
ওয়ারিশ সনদের নামে ৪ হাজার টাকা
বড়উঠান ৭ নম্বর ওয়ার্ডের জাগির পাড়া এলাকার বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন (৩৮) অভিযোগ করে বলেন, “ফোরকান চৌকিদার একটি ওয়ারিশ সনদ করে দেওয়ার কথা বলে আমার কাছ থেকে ৪ হাজার টাকা নেন। পরে তিনি সনদটি করে দিতে পারেননি।”
ভোটার করাতে ৮ হাজার টাকা
একই এলাকার দিনমজুর মাহমুদ হোসেন (৪৮) বলেন, “ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে ভোটার করা প্রয়োজন ছিল। আমরা গ্রামের সহজ-সরল মানুষ, এসব নিয়মকানুন ভালো বুঝি না। ফোরকানের কাছে গেলে তিনি ৮ হাজার টাকার বিনিময়ে ভোটার করে দেওয়ার কথা বলেন। পরে ৮ হাজার টাকা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তাকে দিই।”
তিনি আরও বলেন, “পরে আরেক ছেলেকে ভোটার করার জন্য তার কাছে গেলে আবারও ৮ হাজার টাকা দাবি করেন। ওই টাকা দিতে না পারায় ছেলেকে ভোটার করাতে পারিনি।”
স্ত্রীকে ভোটার করাতে চাওয়া টমটম চালকের কাছেও দাবি ৬ হাজার
জসিম উদ্দিন নামে এক টমটম চালক অভিযোগ করে বলেন, “আমার স্ত্রী পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। চাকরির প্রয়োজনে তাকে ভোটার করাতে ফোরকানের কাছে গেলে তিনি ৬ হাজার টাকা লাগবে বলে জানান। পরে টাকা দিতে না পেরে তার কাছ থেকে ফিরে আসি।”
১০ হাজার টাকার চুক্তির অভিযোগ
আরেক টমটম চালক মো. ইলিয়াস বলেন, “ছেলেকে ভোটার করানোর বিষয়ে পরামর্শ নিতে ফোরকানের কাছে যাই। তিনি ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে কাজটি করে দেওয়ার কথা বলেন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে বলেন। পরে এত টাকা দিতে না পারায় ছেলেকে ভোটার করাতে পারিনি।”
স্ত্রীকে ভোটার করাতে ৫ হাজার টাকা দাবি
রমজান আলী নামে এক সবজি বিক্রেতার অভিযোগ, “স্ত্রীকে ভোটার করানোর বিষয়ে পরামর্শ নিতে ফোরকানের কাছে গেলে তিনি ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ভোটার করে দেওয়ার কথা বলেন।”
ভুক্তভোগীদের এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিবেদকের কাছে ভিডিও বক্তব্য সংরক্ষিত রয়েছে।
‘মানুষ খুশি হয়ে টাকা দেন’
অভিযোগের বিষয়ে বড়উঠান ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার) মো. ফোরকান বলেন, “আমি কাজ করি, মানুষ খুশি হয়ে আমাকে কিছু টাকা দেন। অভিযোগগুলোর মধ্যে ওয়ারিশ সনদের বিষয়টি সত্য। তবে ওয়ারিশ সনদে সমস্যা থাকায় সেটি করতে না পারায় টাকা ফেরত দিয়েছি। বাকি অভিযোগগুলো আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।”
‘মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথা শুনেছি’
বড়উঠান ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, “সে মানুষের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নেওয়ার বিষয়টি শুনেছি। আমাকেও কয়েকজন এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
একই ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য মনজু আক্তার বলেন, “চৌকিদার ফোরকান এ বিষয়ে একজন সাংবাদিক তার কাছে জানতে চেয়েছেন বলে আমাকে ফোন করে জানিয়েছেন। অভিযোগগুলো সত্য হলে সে অবশ্যই অপরাধ করেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।”
তবে অপর একটি সূত্র জানায়, এ ঘটনার পেছনে মূল কারিগর হিসেবে বড়উঠান ইউনিয়নের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পঙ্কজ দত্তের নাম উঠে এসেছে। গ্রাম পুলিশরা মূলত পঙ্কজ দত্তের ইশারায় এসব কর্মকাণ্ড করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার আশ্রয়-প্রশ্রয় না থাকলে একজন গ্রাম পুলিশ এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারেন না বলে মন্তব্য করেছেন এলাকার কয়েকজন সচেতন নাগরিক।
বড়উঠান ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) পঙ্কজ দত্ত গণমাধ্যমকে বলেন, “তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রিদুয়ানুল ইসলাম বলেন, “সুনির্দিষ্টভাবে কেউ লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে আইনগত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।”
যেখানে ভুক্তভোগীরা প্রকাশ্যে লাইভে এসে অভিযোগ করছেন, সেখানে ইউএনওর পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগের শর্ত জুড়ে দেওয়া বিষয়টিকে অনেকটা ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা’ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।














