২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ক্রিকেটার নাঈম হেনস্তায় মামলা আছে, গ্রেপ্তার নেই— কেন অধরা পুলিশ?

চট্টগ্রামে জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে ডিবি পরিচয়ে হেনস্তা ও মারধরের ঘটনায় মামলা হলেও এখনো গ্রেপ্তার হননি অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্য। এ ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠা খুলশী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমানকে কেবল দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও তাকে ঘিরে প্রশ্ন থামছে না।

ঘটনার পর এক আসামিকে আটক দেখানো হলেও বাকি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে, ফৌজদারি মামলার আসামি হয়েও অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তার না হওয়া নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে।

আইনজীবীরা বলছেন, কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগে মামলা হলে তদন্তকারী সংস্থা সাধারণত অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করতে পারে। আবার কোনো আসামি চাইলে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইতে পারেন।

তবে নাঈম হাসানকে মারধর, অপহরণের চেষ্টা ও বেআইনিভাবে আটকে রাখার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত এই দুই প্রক্রিয়ার কোনোটিই দৃশ্যমান হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্তরা পুলিশের সদস্য হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বিষয়টি বিভাগীয় তদন্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা চলছে। অথচ ভুক্তভোগী পক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনাটি শুধু শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়, বরং গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার রাতে। প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ খেলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফেরেন জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসান। বিমানবন্দর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বাসায় ফেরার পথে নগরের লালখান বাজার ফ্লাইওভারের মুখে তার বহনকারী গাড়িটি থামানো হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক সোনা চোরাচালানের একটি চালান আটকের তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকায় চেকপোস্ট বসানো হয়েছিল।

খুলশী থানার তৎকালীন ওসি আরিফুর রহমানের নির্দেশে এসআই শফিকুল ইসলামসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও সোর্স ওই অভিযানে অংশ নেন।

বিমানবন্দরে থাকা একটি সোর্সের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি সিএনজি থামানো হয়। ওই সিএনজিতে থাকা নাঈমকে প্রথমে সন্দেহ করা হয়। পরে পরিচয় জানালেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে।

নাঈমের অভিযোগ, ডিবি পরিচয় দিয়ে তাকে গাড়ি থেকে নামানো হয়। পরে জোর করে পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। বাধা দিলে তাকে মারধর করা হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজন তাকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে শনাক্ত করলেও পুলিশ সদস্যরা তাকে ছেড়ে দেননি।

এসআই শফিকুল ইসলামসহ পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি এক সোর্সও নাঈমকে মারধর করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে বিষয়টি ওসি আরিফুর রহমানকে জানানো হলে তার নির্দেশেই নাঈমকে থানায় নেওয়া হয়।

থানায় নেওয়ার পরও নাঈম নিজের পরিচয় দেন এবং পরিচয়পত্র দেখান বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপরও তাকে হয়রানি করা হয় বলে দাবি করেন তিনি। পরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি তামিম ইকবাল ও পরিচালক ইসরাফিল খসরুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন নাঈম। তারা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

এ ঘটনায় শনিবার সকালে নাঈমের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে খুলশী থানায় মামলা করেন। মামলায় খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল এবং পুলিশ সোর্স সোহেলকে আসামি করা হয়। অভিযোগে মারধর, অপহরণের চেষ্টা ও বেআইনিভাবে আটকে রাখার বিষয় উল্লেখ করা হয়।

মামলার পর সোহেলকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। একই সঙ্গে এসআই শফিকুল ইসলাম ও কনস্টেবল রাসেলকে প্রত্যাহার করা হয়। তবে অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্যকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি।

এদিকে ঘটনার মূল নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযোগ ওঠা ওসি আরিফুর রহমানকে ঘিরেও প্রশ্ন উঠেছে। নাঈম ও তার পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, নাঈমকে থানায় নেওয়া এবং পরবর্তী হেনস্তার ঘটনায় ওসির ভূমিকা ছিল। যদিও ওসি আরিফুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, অভিযানের বিষয়ে তাকে আগে জানানো হয়নি।

এসআই শফিকুল ইসলাম ও তার টিম নাঈমকে থানায় নিয়ে আসার পর তিনি জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তাকে ছেড়ে দেন। অনুমতি ছাড়া অভিযানে যাওয়ায় এসআইয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

ঘটনার পর সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী নাঈমের বাসায় গিয়ে বলেন, ঘটনায় বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে এবং একজনকে আটক করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, ‘মামলা হওয়ার পর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

আরও পড়ুন