২৩ অক্টোবর ২০২৬

গঙ্গা চুক্তি নবায়নে ঢাকার উদ্যোগ; দিল্লির জবাবের অপেক্ষা!

গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে ভারতের সঙ্গে নতুন চুক্তি করতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে নয়াদিল্লিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হলেও এখনো ভারতের আনুষ্ঠানিক জবাব পায়নি ঢাকা। তবে ভারত জানিয়েছে, পানি ও নদীসংক্রান্ত বিষয়গুলো দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) কাঠামোর মধ্যেই আলোচনা করা হবে।

সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি সই হয়েছিল। দুই দেশের পানি ও নদীসংক্রান্ত বিষয়গুলো দ্বিপক্ষীয় যৌথ নদী কমিশনের আলোচনার অংশ। গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির যৌথ কমিটির বৈঠকও কারিগরি পর্যায়ে নিয়মিত হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এদিকে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন চুক্তির প্রস্তুতি শুরু করেছে বাংলাদেশ। দেশের মানুষের পানির অধিকার ও গঙ্গার পানিতে ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করেই নতুন চুক্তি করতে চায় সরকার।

বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আলীমের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানান, অভিন্ন নদীগুলো থেকে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে সরকার সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন চুক্তি প্রণয়নের লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করা হয়েছে।

১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি সই হয়। ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তিটির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর মাসে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে প্রায় তিন দশক পর গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে নতুন সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন চুক্তি শুধু পানির হিস্যা নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বর্তমান সময়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর প্রবাহ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষি ও পরিবেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিকে নতুন চুক্তিতে গুরুত্ব দিতে হবে।

তাঁদের মতে, নতুন চুক্তির কাঠামো তৈরিতে অর্থনীতিবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। গঙ্গার পানিতে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা না গেলে কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনজীবনে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সম্প্রতি মরিশাসে অনুষ্ঠিত নবম ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে অংশ নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণের মৌলিক প্রয়োজন নিশ্চিত করে—এমন একটি নতুন বা সংশোধিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি চায় সরকার।

সম্মেলনের ফাঁকে এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গঙ্গা দুই দেশের অভিন্ন নদী। এই নদীর সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন ঐতিহ্য ও স্বার্থ জড়িত। তাই উভয় দেশের জনগণের আস্থা অর্জন করবে—এমন একটি টেকসই সমাধানে পৌঁছানো জরুরি।

বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক শাহাব এনাম খানও মনে করেন, প্রায় তিন দশক আগের বাস্তবতার ভিত্তিতে করা গঙ্গা চুক্তি বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে সংশোধন করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য চুক্তিটি নবায়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরিবর্তিত বাস্তবতা ও দুই দেশের বর্তমান প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে এতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা দরকার।

ফলে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে নতুন আলোচনা কত দ্রুত শুরু হয় এবং নতুন চুক্তিতে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা ও দীর্ঘমেয়াদি পানির নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হয়—এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।

আরও পড়ুন