২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কমছে তালগাছ, বাড়ছে শাঁসের চাহিদা

গরমে স্বস্তির নাম কচি তালের শাঁস

প্রখর গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। তপ্ত রোদ আর ভ্যাপসা আবহাওয়ায় একটু স্বস্তির খোঁজে মানুষ ছুটছে মৌসুমি ফলের দিকে। আর সেই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে কচি তালের শাঁস। চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে এখন জমে উঠেছে তালের শাঁসের বাজার। তালগাছের সংখ্যা কমে গেলেও এই ফলের প্রতি মানুষের আগ্রহ ও চাহিদা একটুও কমেনি।

সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পৌর সদর থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ের হাট-বাজার— সবখানেই কচি তাল নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। রাস্তার পাশে ছোট ছোট অস্থায়ী দোকানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভিড় করছেন নানা বয়সী মানুষ। গরমে ক্লান্ত শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী— সবাই খুঁজছেন শীতল ও সুস্বাদু এই প্রাকৃতিক খাবার।

বর্তমানে প্রতি পিস তালের শাঁস বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকায়। দাম বাড়লেও ক্রেতার সংখ্যা কমেনি। বরং গরম যত বাড়ছে, তালের শাঁসের চাহিদাও তত বাড়ছে।

তবে এই জনপ্রিয় ফলের পেছনের গল্পটা সুখকর নয়। একসময় গ্রামবাংলার রাস্তার ধারে, মাঠে-ঘাটে অসংখ্য তালগাছ চোখে পড়ত। এখন সেই দৃশ্য প্রায় হারিয়ে গেছে। নির্বিচারে গাছ কাটা, বসতবাড়ি ও অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দিন দিন কমে যাচ্ছে তালগাছের সংখ্যা। নদী ও পাহাড়বেষ্টিত বোয়ালখালীও এর ব্যতিক্রম নয়।

ইউপি প্যানেল চেয়ারম্যান মো. হাসান চৌধুরী বলেন, ‘আগের মতো তাল পাওয়া যায় না। একসময় রাস্তার পাশে প্রচুর তালগাছ ছিল, এখন সেগুলো আর দেখা যায় না। আগে ৪০-৫০ টাকায় এক হালি তাল পাওয়া গেলেও এখন ১০০ থেকে ১২০ টাকা লাগছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে তালগাছ খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে যাবে।’

তালের শাঁস কিনতে আসা সালমা আক্তার বলেন, ‘তালের পিঠার ঐতিহ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। কিন্তু গরমে এক টুকরো তালের শাঁস এখনও মানুষের কাছে প্রশান্তির নাম। তালগাছ রক্ষায় সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’

বিক্রেতা আবদুল হালিম নয়ন জানান, স্থানীয়ভাবে তাল পাওয়া না যাওয়ায় পটিয়া ও রাঙ্গুনিয়া থেকে তাল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আগে এক ছড়া কাঁচা তাল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় পাওয়া যেত। এখন একই ছড়ার দাম এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। তারপরও বিক্রি করছি। প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা লাভ হয়, যা দিয়ে কোনোরকমে সংসার চলে।’

তালগাছের গুরুত্ব শুধু ফলের জন্য নয়, পরিবেশের জন্যও অপরিসীম। বজ্রপাত প্রতিরোধ, মাটির ভারসাম্য রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে তালগাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ বিষয়টি উপলব্ধি করে কিছু মানুষ আবার তালগাছ রোপণে আগ্রহী হচ্ছেন।

২০১৯ সালে বোয়ালখালী পরিবেশ সংরক্ষণ কমিটির উদ্যোগে কধুরখীল ও আকুবদণ্ডী এলাকায় ২০০ থেকে ২৫০টি তালবীজ রোপণ করা হয়েছিল। তবে সেই উদ্যোগের দৃশ্যমান ফল এখনো পাওয়া যায়নি বলে জানান সংগঠনটির তৎকালীন সভাপতি সাংবাদিক রাজু দে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. শাহানুর ইসলাম বলেন, ‘তালের শাঁস শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এটি শরীরের পানির চাহিদা পূরণ করে এবং ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দূর করতে সাহায্য করে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও বজ্রপাত কমাতেও তালগাছের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ সচেতন না হওয়ায় অনেক জায়গায় তালগাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। সরকারি সহায়তা ও বরাদ্দ পাওয়া গেলে কৃষকদের তালগাছ রোপণে উদ্বুদ্ধ করা হবে।’

গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক তালগাছ আজ অস্তিত্ব সংকটে। অথচ সেই গাছের ফলই এখন গ্রীষ্মের দাবদাহে মানুষের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত প্রাকৃতিক স্বস্তি। তাই তালগাছ রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তালের শাঁস হয়তো কেবল গল্পের বিষয় হয়ে থাকবে।

আরও পড়ুন