৩০ এপ্রিল ২০২৬

চট্টগ্রামের পাসপোর্ট অফিসে দালাল চক্র ও ‘সিল সিন্ডিকেট’: ভোগান্তি আর জিম্মি ভুক্তভোগীরা

চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ পাসপোর্ট অফিসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় দালাল চক্র ও কথিত ‘সিল সিন্ডিকেট’-এর দৌরাত্ম্যে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ সেবাপ্রার্থীরা।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী অনলাইনে আবেদন, নির্ধারিত ব্যাংক ফি জমা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাসপোর্ট সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে অফিসের বাইরে ও ভেতরে এক অদৃশ্য অনিয়মের জালে আটকে পড়ছেন আবেদনকারীরা। একই ধরনের অভিযোগ, যদিও তুলনামূলক কম মাত্রায়, উঠছে মনসুরাবাদ পাসপোর্ট অফিসকেন্দ্রিক সেবা ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও।

সরেজমিনে দেখা যায়, পাঁচলাইশ পাসপোর্ট অফিসের মূল ফটকের সামনেই সক্রিয় রয়েছে একাধিক দালাল চক্র। আবেদনকারীরা অফিস এলাকায় প্রবেশের আগেই কিছু ব্যক্তি “সহযোগিতা”, “দ্রুত ডেলিভারি” কিংবা “ঝামেলামুক্ত প্রসেসিং”-এর আশ্বাস দিয়ে তাদের ঘিরে ধরে। বিশেষ করে নতুন আবেদনকারী, শিক্ষার্থী, বিদেশগামী শ্রমিক, নারী আবেদনকারী এবং গ্রামের সাধারণ মানুষদের বেশি টার্গেট করা হয়।

দালালরা সাধারণত দাবি করে, নিজে আবেদন করলে ফরমে ভুল, পুলিশ ভেরিফিকেশন, সিল জটিলতা বা ডকুমেন্ট সমস্যার কারণে আবেদন বিলম্বিত হতে পারে। অথচ তাদের মাধ্যমে গেলে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হবে। এই প্রলোভনে পড়ে অনেকে সরকারি নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা, কখনো কখনো তারও বেশি অর্থ দিতে বাধ্য হন।

শুধু বাইরের দালাল নয়, অভিযোগ রয়েছে অফিসের অভ্যন্তরে একটি শক্তিশালী ‘সিল সিন্ডিকেট’ সক্রিয় রয়েছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পাসপোর্ট আবেদন যাচাই, অনুমোদন বা নির্দিষ্ট ধাপে প্রসেস এগিয়ে নিতে কিছু “বিশেষ সিল” বা অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে দালাল ছাড়া সহজে পাওয়া যায় না। ফলে আবেদনকারীদের ইচ্ছাকৃতভাবে নানা ত্রুটি দেখিয়ে হয়রানি করা হয়।

অনেক ভুক্তভোগী জানান, একই কাগজপত্র নিয়ে সরাসরি আবেদন করলে নানা সমস্যা দেখানো হয়, অথচ দালালের মাধ্যমে গেলে সেই ফাইল খুব সহজেই অনুমোদিত হয়ে যায়। এতে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—এই জটিলতা কি পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি করা হচ্ছে, যাতে অসাধু চক্র সুবিধা নিতে পারে?

একজন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী জানান, “আমি নিজে আবেদন করতে গিয়ে তিনবার ফেরত এসেছি। কখনো ছবি সমস্যা, কখনো কাগজের ঘাটতি বলা হয়েছে। পরে দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার পর দুই দিনেই কাজ হয়ে গেছে।”

অন্যদিকে মনসুরাবাদ পাসপোর্ট অফিস এলাকাতেও দালালদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যদিও পাঁচলাইশের তুলনায় সেখানে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রিত, তবুও ‘দ্রুত সেবা’, ‘জরুরি অনুমোদন’ কিংবা ‘ফাইল ক্লিয়ারেন্স’-এর নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, দালালদের একটি অংশ বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি বা ফটোকপি দোকানের আড়ালে কাজ করে।

সচেতন মহল মনে করছে, ডিজিটাল পদ্ধতি চালু হওয়ার পরও যদি সাধারণ মানুষ দালালের খপ্পরে পড়ে, তবে তা প্রশাসনিক দুর্বলতা ও তদারকির অভাবকেই নির্দেশ করে। অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া সহজ হলেও তথ্যের অভাব, প্রযুক্তিগত অজ্ঞতা এবং স্থানীয় সিন্ডিকেটের প্রভাব সাধারণ মানুষকে বাধ্য করছে অনৈতিক পন্থা বেছে নিতে।

দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে দালাল চক্রের বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা জানালেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। চাঁন্দগাঁও আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, “দালাল চক্রের বিরুদ্ধে আমরা সবসময় সোচ্চার। অফিসের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি এ ধরনের সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে সেবাপ্রার্থীদের দাবি, শুধু অভিযান বা আশ্বাস নয়—দালালমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি, সিসিটিভি মনিটরিং, অভিযোগ গ্রহণের স্বচ্ছ ব্যবস্থা এবং দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক পদক্ষেপ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রীয় সেবা খাতে দালালনির্ভরতা শুধু আর্থিক শোষণ নয়, এটি জনগণের আস্থা বিনষ্ট করে এবং সুশাসনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পাঁচলাইশ ও মনসুরাবাদ পাসপোর্ট অফিসে চলমান এই অনিয়ম দ্রুত বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে এবং সরকারি সেবার ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—পাসপোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবা হবে স্বচ্ছ, সহজ ও হয়রানিমুক্ত। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, চট্টগ্রামের কিছু পাসপোর্ট অফিসে এখনো দালাল ও সিন্ডিকেটের প্রভাব পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি, কঠোর ও টেকসই পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

আরও পড়ুন