৬ অক্টোবর ২০২৬

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার, সেপ্টেম্বরেই ১৬ মৃত্যু

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৯১৪ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ২১ জন। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৪৩০ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৫ অক্টোবর সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১০৭ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৬০ জন। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৪ হাজার ৬৫৪ জন।

বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ তুলনামূলক কম থাকলেও জুন থেকে পরিস্থিতির অবনতি শুরু হয়। জানুয়ারিতে ৬৮, ফেব্রুয়ারিতে ২২, মার্চে ২০, এপ্রিলে ২৯ এবং মে মাসে ৩৭ জন আক্রান্ত হন।

জুনে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয় ১২২ জন। জুলাইয়ে ৫৩৬, আগস্টে ১ হাজার ২০২ এবং সেপ্টেম্বরে এক লাফে ২ হাজার ৪৩০ জনে পৌঁছে যায়। অক্টোবরের প্রথম পাঁচ দিনেই নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৪৪৮ জন।

মৃত্যুর দিক থেকেও সেপ্টেম্বর ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। এ মাসে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া জুলাইয়ে দুজন, আগস্টে দুজন এবং ফেব্রুয়ারিতে একজন মারা যান। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।

চলতি বছরের মোট আক্রান্তদের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে ২ হাজার ২৮৫ জন, উপজেলা পর্যায়ে ২ হাজার ৯৮ জন এবং অন্যান্য জেলা থেকে এসে চিকিৎসা নেওয়া ৫৩১ জন রয়েছেন।

উপজেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে সীতাকুণ্ডে— ৬২০ জন। এরপর কর্ণফুলীতে ২৮৫, বাঁশখালীতে ১৫৪, রাঙ্গুনিয়ায় ১৫২, সাতকানিয়ায় ১২১, আনোয়ারায় ১১২, রাউজানে ১০৩ এবং পটিয়ায় ১০০ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

এ ছাড়া হাটহাজারীতে ৮৪, চন্দনাইশে ৭৭, বোয়ালখালীতে ৭৬, লোহাগাড়ায় ৬৬, মিরসরাইয়ে ৭৯, ফটিকছড়িতে ৪৪ এবং সন্দ্বীপে ২৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

চলতি বছরের আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ২ হাজার ৪০২, নারী ১ হাজার ৪০৩ এবং শিশু ১ হাজার ১০৯ জন। অন্যদিকে ডেঙ্গুতে মৃত ২১ জনের মধ্যে পুরুষ চারজন, নারী ১১ জন এবং শিশু ছয়জন। অর্থাৎ আক্রান্তের সংখ্যা পুরুষদের বেশি হলেও মৃত্যুর হিসাবে নারী ও শিশুদের সংখ্যা বেশি।

গত দুই বছরের তুলনায়ও চলতি বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৪ সালে জেলায় ৪ হাজার ৩২৩ জন আক্রান্ত হয়ে ৪৫ জন মারা যান। ২০২৫ সালে আক্রান্ত হন ৪ হাজার ৮৬৪ জন এবং মৃত্যু হয় ২৭ জনের।

চলতি বছরের ৫ অক্টোবরেই আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯১৪ জনে। অর্থাৎ বছরের শেষ তিন মাস শুরু হওয়ার আগেই আগের দুই বছরের যেকোনো এক বছরের মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে।

ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়লেও নগরীতে মশক নিধন কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ রয়েছে নগরবাসীর। হামজারবাগ সঙ্গীত আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মুনতাসির উদ্দিন অভিযোগ করেন, এলাকায় মশার উপদ্রব বেড়েছে। কিন্তু নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম চোখে পড়ে না।

চন্দনপুরা এলাকার বাসিন্দা জামাল উদ্দিন বলেন, ডেঙ্গু রোগী বাড়লেও সে অনুযায়ী মশক নিধন ও তদারকি বাড়েনি।

জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা জরুরি। জ্বর হলে দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক শেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব আশরাফুল আমিন জানান, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম চলছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রামও পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে শুধু ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; বাসাবাড়ি, ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

আরও পড়ুন