২৩ অক্টোবর ২০২৬

চট্টগ্রামে বন্যার পর বিষধর সাপের তাণ্ডব, বাড়ছে সাপে কাটা রোগী

চট্টগ্রামে টানা বন্যার পানি এখন শুধু ঘরবাড়ি নয়, মানুষের জীবনে নিয়ে এসেছে আরেক ভয়াবহ আতঙ্ক— বিষধর সাপ। পানিবন্দি এলাকার ঘর, খাট, আলমারি, এমনকি ঘুমন্ত মানুষের বিছানাতেও ঢুকে পড়ছে সাপ। গত এক সপ্তাহে সাপে কাটা অন্তত ৮৫ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে তিনজন বিষধর সাপের ছোবলে গুরুতর আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

সাতকানিয়া উপজেলার কেওচিয়া গ্রামের বাসিন্দা মাওলানা নুরুল হক বন্যার এই ভয়াবহ বাস্তবতার এক জীবন্ত উদাহরণ। গভীর রাতে ঘুমের মধ্যে হঠাৎ হাতে তীব্র ব্যথা অনুভব করে জেগে উঠে তিনি দেখতে পান হাতে দুটি দাঁতের দাগ। পাশে তাকাতেই দেখতে পান একটি বিষধর পদ্মগোখরা ফণা তুলে রয়েছে। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান। পরে ওয়াইল্ড লাইফ অ্যান্ড রেসকিউ টিম তার ঘর থেকে সাপটি উদ্ধার করে।

একই রাতে পাশের পটিয়া উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের বাসিন্দা জরিপ আলীও বাড়ির কাছে হাঁটার সময় সাপের কামড়ে আহত হন। পরে জানা যায়, তাকে নির্বিষ সাপ কামড়েছিল। তবে বন্যার কারণে এমন ঘটনা এখন দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, সাতকানিয়া, পটিয়া, বোয়ালখালী, আনোয়ারা, বাঁশখালীসহ বন্যাকবলিত উপজেলাগুলো থেকেই সবচেয়ে বেশি সাপে কাটা রোগী হাসপাতালে আসছেন। গত ৯ জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত ৮৫ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম সরবরাহ করা হয়েছে। জেলা পর্যায়েও প্রায় ১০০ রোগীর চিকিৎসার উপযোগী এক হাজার ভায়াল অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে।

চমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী বলেন, অধিকাংশ রোগী নির্বিষ সাপে আক্রান্ত হলেও পদ্মগোখরা, শঙ্খিনী, কালাচ, লালগলা ঢোঁড়া ও সবুজ বোড়ার মতো বিষধর সাপের উপস্থিতিও বেড়েছে। সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারলে অধিকাংশ রোগীকেই সফলভাবে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।

সাপ গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরীর মতে, তিনটি কারণে এবার সাপের উপদ্রব বেড়েছে। বর্ষাকাল সাপের প্রজননের মৌসুম হওয়ায় তারা বেশি সক্রিয় থাকে। বন্যার পানিতে প্রাকৃতিক আবাসস্থল তলিয়ে যাওয়ায় সাপ লোকালয়ে আশ্রয় নিচ্ছে। পাশাপাশি কিছু নির্বিষ সাপ ডিম পাড়ার জন্য মানুষের ঘরেও ঢুকে পড়ছে।

তিনি জানান, বর্ষা ও বন্যার সময় কোবরা, কেউটে, দাঁড়াশ, পানিসাপ বেশি দেখা যায়। পাহাড়ি ঢলের কারণে কিং কোবরা ও অজগরের মতো বড় সাপও লোকালয়ে চলে আসতে পারে। বিশেষ করে কেউটে সাপ ঘুমন্ত মানুষকে কামড়ানোর ঝুঁকি বেশি তৈরি করে।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ বন্যাকবলিত মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। রাতে চলাচলের সময় টর্চ ব্যবহার, হাতে লাঠি রাখা, জমে থাকা পানিতে সতর্কভাবে চলাফেরা, মেঝেতে না ঘুমানো এবং অবশ্যই মশারি ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সাপে কাটলে ওঝা বা কবিরাজের কাছে না গিয়ে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলা ও মহানগরের প্রায় ৯ লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দি। প্রাণ হারিয়েছেন ১১ জন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঁশখালী, লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, আনোয়ারা, পটিয়া ও বোয়ালখালী উপজেলা। বন্যার পানি না নামা পর্যন্ত বিষধর সাপের এই আতঙ্কও কাটছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আরও পড়ুন