চট্টগ্রামে ফেসবুক মার্কেটপ্লেসে বিক্রির জন্য দেওয়া একটি আইফোন-১৭ প্রো ম্যাক্স কিনতে আগ্রহী ক্রেতা সেঁজে অভিনব কৌশলে লাখ টাকার মোবাইল ফোন আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীর দাবি, নিজেকে অলংকার এলাকার এক ব্যবসায়ীর ছেলে পরিচয় দিয়ে, ভাড়া করা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার এবং চালককে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিতে নির্দেশনার মাধ্যমে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। গত ৩ জুলাই নগরীর সদরঘাট হতে পাহাড়তলী থানা এলাকায় এ ঘটনা সংঘটিত হয়।
ভুক্তভোগী মোজাম্মেল হোসেন (৩৫) সদরঘাট এলাকার বাসিন্দা। তিনি জানান, ব্যবহৃত আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স বিক্রির জন্য ফেসবুক মার্কেটপ্লেসে বিজ্ঞাপন দেওয়ার পর আবদুল্লাহ আল মাহিম নামে এক ব্যক্তি তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
পরে গত ৩ জুলাই (শুক্রবার) সকাল ৭টার দিকে ০১৭৭২-৭১২৩৯৩ নম্বর থেকে ফোন করে জরুরি কাজের কথা বলে সকাল ৯টার মধ্যে ফোনটি দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মাহিম চট্টগ্রাম মহানগরীর সদরঘাট থানার সামনে কালো রঙের একটি টয়োটা এলিয়ন (চট্ট মেট্রো-গ-১৩-০৯০৫) গাড়ি নিয়ে উপস্থিত হন।
তিনি নিজেকে অলংকার এলাকার একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মতিন সাহেবের ছেলে পরিচয় দিয়ে দাবি করেন, তাদের অলংকারে নিজস্ব মার্কেট রয়েছে।
ভুক্তভোগীর ভাষ্য, ফোনটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার একপর্যায়ে মাহিম জানান, সফটওয়্যারসহ কিছু বিষয় কম্পিউটারের মাধ্যমে পরীক্ষা করতে হবে। পরে তিনি ভুক্তভোগীকে সঙ্গে নিয়ে অলংকার এলাকায় তার কথিত বাসার সামনে যান।
সেখানে মাহিম ফোনটি নিয়ে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেন এবং প্রায় ১০ মিনিট পর ফিরে এসে জানান, ফোনে কোনো সমস্যা নেই। এরপর তিনি এক লাখ ৩৫ হাজার টাকায় ফোনটি কিনতে সম্মত হন।
এরপর তিনি মূল্য পরিশোধের আগে ফোন থেকে অ্যাপল আইডি অপসারণ ও ডিভাইসটি রিসেট করতে বলেন। ভুক্তভোগী তার কথামতো সেটি করেন।
পরে মাহিম ব্যাংক হিসাব নম্বর নিয়ে জানান, তার বাবা বা বড় বোনের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা পাঠানো হবে। একই সঙ্গে তিনি ফোনের বক্স, চার্জার, ক্রয়ের রসিদ ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি আনতে বলেন এবং ফোনটি নিজের কাছে রেখে ভুক্তভোগীকে একই গাড়িতে বাসায় পাঠান।
ভুক্তভোগী বাসা থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ফিরে এসে দেখেন, মাহিমের মোবাইল নম্বর বন্ধ। পরে গাড়িচালক ভবনের ভেতরে খোঁজ নিয়ে এসে জানান, ওই ভবনে আবদুল্লাহ আল মাহিম নামে কিংবা ওই নম্বর ব্যবহারকারী কোনো ব্যক্তি থাকেন না।
পরবর্তীতে চালক বিকাশ চন্দ্র পাল স্বীকার করেন, গাড়িটি মাহিমের নয়। প্রকৃত মালিক অন্য ব্যক্তি। মাহিম সকালে গাড়িটি ভাড়া করে তাকে এমনভাবে আচরণ করতে বলেছিলেন, যাতে ভুক্তভোগীর কাছে মনে হয় গাড়িটি তার নিজের এবং তিনি ওই বাসার বাসিন্দা।
এ ঘটনায় প্রতারণার শিকার হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে ভুক্তভোগী ঘটনাস্থলের ছবি ধারণ করেন এবং গাড়ির প্রকৃত মালিক জাহাঙ্গীরের সঙ্গে পাহাড়তলী থানায় যান। পরে থানার পরামর্শে ৩ জুলাই পাহাড়তলী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডি নম্বর-১১৯। বিষয়টি তদন্ত করছেন এসআই খোকন দাস। ডিউটি অফিসার খাদিজা বেগম জিডিটি প্রস্তুত করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পাহাড়তলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ নুরুল আবছাঁর।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ভুয়া পরিচয়, ভাড়া করা গাড়ি ব্যবহার এবং চালককে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিতে নির্দেশ দেওয়ার ঘটনাগুলো থেকে স্পষ্ট, এটি একটি সুপরিকল্পিত সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের কাজ। তিনি দ্রুত অভিযুক্ত আবদুল্লাহ আল মাহিম ও তার সহযোগীদের শনাক্ত করে গ্রেফতার, আত্মসাৎ হওয়া মোবাইল ফোন উদ্ধার এবং চক্রটির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে শিগগিরই চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে অভিযোগ করবেন। প্রয়োজন হলে নিয়মিত মামলাও দায়ের করবেন। পাহাড়তলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ নুরুল আবছাঁর বলেন, ‘বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। আশা করি অপরাধী শিগগিরই ধরা পড়বেন।’
অন্যদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতারক মাহিম ব্যবহৃত গ্রামীণফোন (জিপি) নম্বর থেকে ঘটনার দিন, ৩ জুলাই, সর্বশেষ সকাল ১০টা ১৮ মিনিট ২১ সেকেন্ডে ভুক্তভোগীর সঙ্গেই কথা বলেন। সে সময় তার অবস্থান ছিল চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকায়।
আরও জানা গেছে, ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটির নিবন্ধন বরিশালের মো. শহিদুল ইসলাম হাওলাদার নামে এক ব্যক্তির নামে। এ তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, ‘আবদুল্লাহ আল মাহিম’ নামটি ছদ্মপরিচয় হতে পারে। এছাড়া প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ফেসবুক অ্যাকাউন্টটিও ভুয়া বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। কারণ, অ্যাকাউন্টে ব্যবহৃত ছবির সঙ্গে প্রতারকের কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
এদিকে, চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অপরাধ তদন্তে অভিজ্ঞ এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ভুক্তভোগীর শুরুতেই সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। তার ভাষ্য, ফেসবুক প্রোফাইলের ছবির সঙ্গে সামনাসামনি দেখা ব্যক্তির চেহারার মিল না থাকায় ভুক্তভোগীর তার সঙ্গে যাওয়া উচিত হয়নি।
তিনি আরও বলেন, প্রতারক যখন ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে, তখন গাড়িচালকের পরিচয় ও গাড়ির প্রকৃত মালিকানা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন ছিল। তদন্তের স্বার্থে চালকের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ, তিনি নিজেকে ভাড়া করা গাড়ির চালক হিসেবে পরিচয় না দিয়ে প্রতারকের পরিচয়কে সমর্থন করে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন, যা ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার প্রশ্নও উত্থাপন করছে।














