চট্টগ্রামের যানজট নিরসনে মেট্রোরেল নাকি মনোরেল— এ প্রশ্নে যখন চলছে জোর আলোচনা, তখনই ভিন্ন সুর তুলেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পে যাওয়ার আগে নগরের মৌলিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও গণপরিবহন সংকট সমাধান জরুরি। বাস্তবতা বিবেচনায় এখনই মেট্রোরেল বা মনোরেল কোনোটিই চট্টগ্রামের জন্য উপযুক্ত সমাধান নয় বলে মত দিয়েছেন তারা।
চট্টগ্রাম মহানগর এলাকার জন্য পরিবহন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ করছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মেট্রোরেল, লাইট রেল ট্রানজিট (এলআরটি) ও মনোরেলের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। তবে এর মধ্যেই মেট্রোরেল ও মনোরেলকে ঘিরে মতবিরোধ সামনে এসেছে।
ডিটিসিএ সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া ‘চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় আরবান মেট্রোরেল ট্রানজিট নির্মাণের পরিবহন মহাপরিকল্পনা ও প্রাথমিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা’ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রায় ৭০ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের মাধ্যমে চট্টগ্রামের দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন কৌশল নির্ধারণ করা হবে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম সফর শেষে ডিটিসিএ’র নির্বাহী পরিচালক ড. মো. মশিউর রহমান জানান, যাত্রী চাহিদা ও ট্রাফিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত সুপারিশ দেওয়া হবে। চাহিদা বেশি হলে মেট্রোরেল, মাঝারি হলে এলআরটি এবং কম হলে মনোরেলের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হবে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন মনোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর দাবি, বিদেশি বিনিয়োগে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে সাড়ে ৫৪ কিলোমিটার দীর্ঘ তিনটি রুটে মনোরেল নির্মাণ করা সম্ভব। এ জন্য চসিকের আর্থিক দায় থাকবে না।
তবে ডিটিসিএ’র প্রকল্প পরিচালক ও ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ার মীর মোহাম্মদ কামরুল হাসান মনে করেন, চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় মেট্রোরেলই অধিক কার্যকর। তার ভাষায়, মনোরেলের যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা মেট্রোরেলের তুলনায় অনেক কম। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটি একক সমাধান হতে পারবে না। তবে ফিডার সার্ভিস হিসেবে মনোরেল ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
এদিকে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম বলেছেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে, যাতে প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এবং চট্টগ্রামের পরিবেশ ও নগর কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
তবে সবচেয়ে কঠোর সমালোচনা এসেছে পরিবহন বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে। পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বলেন, ‘চট্টগ্রামের মূল সমস্যা মেগা প্রকল্পের অভাব নয়, বরং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। তার মতে, রাজধানীতে দীর্ঘদিনেও কার্যকর গণপরিবহন ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে না পারা সংস্থার ওপর নতুন মেগা প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।’
তিনি বলেন, বহদ্দারহাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত ইতোমধ্যে অসংখ্য ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে। ফলে নতুন করে মেট্রোরেলের পিলার ও স্টেশন নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সুভাষ বড়ুয়ার মতে, হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের আগে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বাস সার্ভিস উন্নয়ন, লেন শৃঙ্খলা এবং নগরের বিকেন্দ্রীকরণে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে পারলে চট্টগ্রামের অধিকাংশ যানজট সমস্যার সমাধান সম্ভব।
একই ধরনের মত দিয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার। তিনি বলেন, মেট্রোরেল বা মনোরেলের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্পের আগে এর প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে গভীর সমীক্ষা হওয়া দরকার ছিল।
তার মতে, অনেক সময় প্রকল্পের সিদ্ধান্ত আগে নেওয়া হয়, পরে তার পক্ষে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সাজানো হয়। এতে জনস্বার্থের চেয়ে প্রকল্পকেন্দ্রিক ব্যয় ও অবকাঠামো নির্মাণ বেশি গুরুত্ব পায়।
দেলোয়ার মজুমদার বলেন, বর্তমানে একই সড়কে রিকশা, বাস, ট্রাক, ঠেলাগাড়ি ও পথচারীরা চলাচল করছে। অনেক জায়গায় ফুটপাত দখল হয়ে থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে সড়কে হাঁটছে। ফলে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। এসব মৌলিক সমস্যা সমাধান না করে সরাসরি মেট্রোরেল বা মনোরেলের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্পে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।














