চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্ব নির্বাচন ঘিরে টানাপোড়েন ও বিভক্তির চিত্র সামনে এসেছে। মহানগর আমির নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মহানগর জামায়াতের সাবেক আমির ও সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীকে ভোট না দেওয়ার বিষয়ে দেওয়া একটি বক্তব্য ঘিরে এ বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।
গত ১৮ অক্টোবর নগরীর জিইসি কনভেনশন হলে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের রুকন (সদস্য) সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে মহানগর আমির নির্বাচনের ভোটগ্রহণও সম্পন্ন হয়। তবে নির্বাচনের ফলাফল এখনো ঘোষণা করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা, আগামী ডিসেম্বরে ফলাফল ঘোষণা করা হতে পারে।
সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে জামায়াতের চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মাওলানা মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘আমির নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেন্দ্রে দায়িত্বে থাকা কোনো জনশক্তিকে আমির পদে ভোট দেওয়া যাবে না।’
জামায়াতের একাধিক রুকনের দাবি, এ বক্তব্যের মাধ্যমে মূলত মহানগর জামায়াতের সাবেক আমির ও বর্তমান সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীকে ভোট না দেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, আমির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলের ভেতরে নির্দিষ্ট একটি বলয়ের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে। এতে মহানগর জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘একটি শাখার আমির নির্বাচনে কেবল সংশ্লিষ্ট শাখার ভোটার তালিকাভুক্ত রুকনরাই ভোট দিতে পারেন। ভোটার তালিকার বাইরে থাকা কাউকে ভোট দিলে সেই ভোট বাতিল হওয়ার কথা। আমার ইনস্ট্রাকশনে (নির্দেশনায়) ছিল ভোটার তালিকার বাইরে আমাকেও কোনো ভোট দেবেন না। অন্য কাউকেও ভোট দেবেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমির নির্বাচনে কাকে ভোট দেওয়া হবে, সেই স্বাধীনতা রুকনদের। দীর্ঘদিন একই ব্যক্তি আমিরের দায়িত্বে থাকলে নতুন নেতৃত্ব তৈরির বিষয়টিও বিবেচনায় আসতে পারে। রুকনদের অধিকার রয়েছে, তাঁরা চাইলে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা নেতার পরিবর্তে অন্য যোগ্য ও সম্ভাবনাময় নেতৃত্বকে বেছে নিতে পারেন।’
নেতৃত্ব নিয়ে দুই বলয়ের আলোচনা
দলীয় একাধিক সূত্রের দাবি, চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতে নেতৃত্ব নির্বাচন ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আলমগীর হোসেন নামে দলের এক দায়িত্বশীলের ভাষ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মাওলানা মোহাম্মদ শাহজাহান, সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী, নগর শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি এসএম লুৎফুর রহমান এবং সহকারী সেক্রেটারি ফয়সল মোহাম্মদ ইউনুসকে ঘিরে একটি বলয় রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এ বলয়ের বাইরে থাকা ব্যক্তিদের ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, শাহজাহান চৌধুরীর অনুসারী বলে পরিচিত একাধিক রুকনের দাবি, তিনি মহানগর আমির থাকাকালে দলীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ও সাংগঠনিক তৎপরতা বেশি ছিল। তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর মহানগর জামায়াতের সাংগঠনিক গতিশীলতা কমেছে বলেও তাঁদের দাবি।
তবে এসব বক্তব্যের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অবস্থান সমানভাবে জানা যায়নি।
আমির পদ থেকে সরানো হয় শাহজাহান চৌধুরীকে
দলীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর শাহজাহান চৌধুরী চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমির হিসেবে শপথ নেন। পরে গত বছরের ১৪ জুন এক জরুরি দায়িত্বশীল বৈঠকে তাঁকে ওই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর নজরুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
একই বছরের ৫ নভেম্বর রুকনদের প্রত্যক্ষ ভোটে ২০২৫-২৬ মেয়াদের জন্য মহানগর আমির নির্বাচিত হন নজরুল ইসলাম। ওই দিন নগর জামায়াতের কার্যালয় বিআইএ মিলনায়তনে তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান কেন্দ্রীয় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য মাওলানা মোহাম্মদ শাহজাহান।
দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতে প্রায় তিন হাজার রুকন রয়েছেন। গত ১৮ অক্টোবরের সম্মেলনে তাঁদের অধিকাংশ উপস্থিত ছিলেন এবং আমির নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। তবে শাহজাহান চৌধুরীর নাম প্রার্থী তালিকায় না থাকায় অনেক রুকন ভোট দেননি বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে ২০২৪-২৫ মেয়াদে রুকনদের এক হাজার ৪০০ ভোট পেয়ে মহানগর আমির নির্বাচিত হয়েছিলেন শাহজাহান চৌধুরী।
নজরুল ইসলাম কি আবারও আমির হচ্ছেন?
সর্বশেষ ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০২৬-২৭ মেয়াদেও বর্তমান আমির নজরুল ইসলাম পুনর্নির্বাচিত হতে পারেন। শাহজাহান চৌধুরীর নাম প্রার্থী তালিকায় না থাকা এবং নির্বাচন ঘিরে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এ আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এদিকে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের কারণে শাহজাহান চৌধুরী বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন বলে দলীয় সূত্রের দাবি। বর্তমানে তিনি সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনের সংসদ সদস্য এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও তাঁকে চট্টগ্রাম মহানগর আমিরের পদ থেকে দূরে রাখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
সব মিলিয়ে, চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমির নির্বাচন ঘিরে নেতৃত্বের সমীকরণ, প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ও রুকনদের ভোটাধিকার নিয়ে দলটির অভ্যন্তরে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। এখন সবার নজর নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল এবং এর পর দলীয় নেতৃত্বের অবস্থান কী দাঁড়ায়, সেদিকে।














