২৩ অক্টোবর ২০২৬

অ্যাসাইকুডায় ‘লক’, কিন্তু বন্দরে নেই ২৫০ কনটেইনার!

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ‘গায়েব’ ২৫০ কনটেইনার, ৫ দফা চিঠিরও জবাব মেলেনি

চট্টগ্রাম বন্দরে চোরাচালান ও রাজস্ব ফাঁকির সন্দেহে খালাসে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া ২৫০টি পণ্যবাহী কনটেইনারের কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। এসব কনটেইনারের ডেলিভারি স্ট্যাটাস চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড (ASYCUDA World) সিস্টেমে ‘লক’ থাকলেও বাস্তবে সেগুলো বন্দরে নেই বলে দাবি করেছে কাস্টমস।

বিষয়টি নিয়ে গত সাত মাসে পাঁচ দফা চিঠি পাঠানো হলেও বন্দর কর্তৃপক্ষ কোনো জবাব দেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। কাস্টমস সূত্র জানায়, ২০২১ সাল থেকে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পাঁচ শতাধিক কনটেইনারের খালাস স্থগিত করা হয়। এর মধ্যে কিছু কনটেইনার যথাযথ প্রক্রিয়ায় খালাস বা নিলাম হলেও ২৫০টির বিপরীতে কোনো বিল অব এন্ট্রি দাখিল হয়নি। অর্থাৎ, আমদানিকারকের পক্ষ থেকে পণ্য খালাসের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সম্প্রতি নিলামে বিক্রি হওয়া দুটি কনটেইনারের ক্রেতা ইয়ার্ডে গিয়ে সেগুলো খুঁজে না পাওয়ার পর বিষয়টি সামনে আসে। এরপর কাস্টমস কনটেইনারগুলোর অবস্থান যাচাই করতে গিয়ে দেখতে পায়, অ্যাসাইকুডা সিস্টেমে লক থাকা ২৫০টি কনটেইনারের বাস্তব অস্তিত্ব মিলছে না। এর মধ্যে ২০২১ সালের ৮৩টি, ২০২২ সালের ৬১টি, ২০২৩ সালের ৪০টি এবং ২০২৪ সালের ৬৬টি কনটেইনার রয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ডেপুটি কমিশনার তারেক মাহমুদ বলেন, গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কনটেইনারগুলোর খালাস বন্ধ রাখা হয়েছিল। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর কায়িক পরীক্ষা করতে গিয়ে সেগুলো আর পাওয়া যায়নি। কনটেইনার সংরক্ষণের দায়িত্ব বন্দর কর্তৃপক্ষের হওয়ায় তাদের কাছে একাধিকবার ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

তিনি আরও বলেন, বন্দরের ভেতরে প্রায় ৩৫ হাজার কনটেইনার থাকে। নিখোঁজ কনটেইনারগুলো সেখানে রয়েছে নাকি ইতোমধ্যে বের হয়ে গেছে—এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য দিতে পারবে বন্দর কর্তৃপক্ষই। তাদের নীরবতায় কনটেইনারগুলো হারিয়ে গেছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এসব কনটেইনারে কী ধরনের পণ্য ছিল, তা দ্রুত নিশ্চিত করা জরুরি। অতীতে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১০ ট্রাক অস্ত্র, বিপুল পরিমাণ কোকেন, পপি সিড (পোস্তদানা), বিদেশি মদ ও সিগারেটসহ বড় বড় চোরাচালানের চালান ধরা পড়েছে। ফলে নিখোঁজ কনটেইনারগুলোর বিষয়টি শুধু রাজস্ব নয়, জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর এমদাদ বলেন, ছয় মাসের বেশি সময় ধরে কাস্টমসের চিঠির জবাব না দেওয়া দায়িত্বে অবহেলার শামিল। কনটেইনারগুলো কোথায় গেছে এবং সেগুলোতে কী ছিল, তা দ্রুত উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি।

তবে সম্প্রতি বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম মনিরুজ্জামান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জাল ও ডিজিটাল নথি ব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র অবৈধভাবে পণ্য খালাসের চেষ্টা করছে। তাদের শনাক্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় কাজ চলছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা ও প্রশাসন) জাফর আলম বলেন, একটি কনটেইনার বন্দর থেকে বের করতে বন্দর ও কাস্টমস—উভয় পক্ষের প্রক্রিয়া জড়িত। তাই কনটেইনার নিখোঁজের ঘটনায় উভয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন