দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে নির্বাচনবিহীন অবস্থায় থাকা চসিকের জাতীয়তাবাদী শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নকে ঘিরে এবার বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন সাধারণ কর্মচারীরা। অভিযোগ উঠেছে, বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন, নিজস্ব সংবিধান লঙ্ঘন, মেয়রের নির্দেশ অমান্য এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একটি ‘পকেট কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। এ নিয়ে শ্রম অধিদপ্তর ও ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা পড়লেও সংশ্লিষ্টদের রহস্যজনক নীরবতা নতুন করে জন্ম দিয়েছে নানা প্রশ্নের।
বিশেষ করে সংগঠনটির দ্বিতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণার পর থেকে এর অভ্যন্তরে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সাধারণ কর্মচারীদের মনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন- কোন জাদুবলে ও কী কারণে বিতর্কিত ব্যক্তিরা এই কমিটির শীর্ষ পদে জায়গা করে নিলেন?
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৭ সালে কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে এই শ্রমিক ইউনিয়ন। সে সময় রেজিস্ট্রার অব ট্রেড ইউনিয়নের পরিচালক গিয়াস উদ্দিন কমিটিটি সত্যায়িত করেন। তবে শুরু থেকেই এ কমিটিকে অনুমোদন দেওয়া নিয়ে নানা বিতর্ক ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। সংগঠনের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চা উপেক্ষা করে তড়িঘড়ি করে কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। সে সময় বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে গেলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বিতর্ক আরও বড় আকারে সামনে আসে দ্বিতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি গঠনের সময়।
শ্রমিকদের অভিযোগ, কোনো রকম যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা কিংবা দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অবদানকে মূল্যায়ন না করে, কেবল বিপুল অঙ্কের টাকার গোপন লেনদেনের মাধ্যমেই এই কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো বণ্টন করা হয়েছে। বিশেষ করে সভাপতি মামুনুর রশিদ, সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সবুর খান এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদকে ঘিরে এই রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে।
আহ্বায়ক কমিটির সদস্যসহ বর্তমান কমিটির অনেক নেতাকর্মীর দাবি, শ্রমিক ইউনিয়নের মতো একটি গণতান্ত্রিক সংগঠনে যেখানে ব্যালটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্ধারিত হওয়ার কথা, সেখানে ভোট ছাড়াই কোন কৌশল হয়ে উঠেছে পদ পাওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি। ত্যাগী ও প্রকৃত শ্রমিকবান্ধব নেতাদের পাশ কাটিয়ে কেন এই চার ব্যক্তিই শীর্ষ পদে বসলেন, তা নিয়ে পুরো চসিকে বইছে সমালোচনার ঝড়।
এই নেতারা কোন যোগ্যতায় এবং কী কারণে কমিটিতে জায়গা পেলেন— তার একটি চাঞ্চল্যকর চিত্র তুলে ধরেছেন চসিকের ভারপ্রাপ্ত উপকর কর্মকর্তা দিদারুল আলম খান। তিনি বলেন, ‘বর্তমান সভাপতি মামুনুর রশিদ আগে ছিলেন একজন সাধারণ নৈশপ্রহরী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং শ্রমিক লীগের সরাসরি সহায়তায় তিনি রাতারাতি ‘সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা’ বনে যান। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন আগে ছিলেন এমএলএসএস কাম সেলসম্যান, যা চসিকের একেবারে নিচের দিকের পদ। বর্তমানে তিনি সহকারী কেরানি।’
সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলছেন, যারা একসময় অন্য রাজনৈতিক আদর্শের (শ্রমিক লীগ) সুবিধাভোগী ছিলেন এবং যাদের প্রাতিষ্ঠানিক পদের কোনো শক্ত ভিত্তি নেই, তারা কীভাবে রাতারাতি ‘জাতীয়তাবাদী’ শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের মতো বড় সংগঠনের হর্তাকর্তা হয়ে বসলেন?
সংগঠনের শীর্ষ পদটি নিশ্চিত করতে বর্তমান কমিটি নিজস্ব সংবিধানের একটি বড় ফাঁক তৈরি করেছে। সংগঠনের সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারায় ২০১৭ সালের আহ্বায়ক কমিটিতে সহ-সভাপতির দায়িত্বে থাকা সেলিম উদ্দিন ভূঁইয়ারই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সভাপতির দায়িত্বে আসার কথা ছিল। কিন্তু নেপথ্যের কুশীলবরা সংবিধানের সেই স্পষ্ট ধারাকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেলিম উদ্দিনকে মাইনাস করে সভাপতি পদে বসায় মামুনুর রশিদকে।
নেতৃত্বের এই ক্ষমতার লোভ ও পকেট কমিটি গঠনের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত উপকর কর্মকর্তা দিদারুল আলম খান বলেন, ‘বর্তমানে যারা নিজেদের সভাপতি-সেক্রেটারি দাবি করছেন, মেয়র মহোদয়ের নির্দেশেই তাদের সঙ্গে আমরা জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদে বৈঠক করেছিলাম। সেখানে মেয়র মহোদয় স্পষ্টভাবে বলেছিলেন— সবাইকে নিয়ে একটি সমন্বিত কমিটি গঠন করতে। কিন্তু ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে তারা মেয়রের নির্দেশ অমান্য করে নিজেদের পছন্দের লোকদের নিয়ে একটি স্বঘোষিত কমিটি গঠন করে ফেলে।’
দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে মামলা জটিলতার কারণে এই সংগঠনে নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন হয়নি। সেই সুযোগে একটি ‘কুচক্রী মহল’ সাধারণ কর্মচারীদের পাশ কাটিয়ে গোপনে এই কমিটি অনুমোদনের চেষ্টা চলায় ক্ষোভে ফুঁসছেন কর্মচারীরা। সম্প্রতি তারা রেজিস্ট্রার অব ট্রেড ইউনিয়নের পরিচালক এবং শ্রম অধিদপ্তরের পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ২০১৭ সাল এবং সর্বশেষ চলতি বছরের ১৩ মার্চ আপত্তি জানানোর পরও, পরিচালক গিয়াস উদ্দিনের অফিসের কিছু অসাধু কর্মচারী এবং রেহান ইমরানের যোগসাজশে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এই ‘অবৈধ কমিটি’ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অবৈধভাবে কমিটি অনুমোদনের বিষয়ে জানতে রেজিস্ট্রার অব ট্রেড ইউনিয়নের পরিচালক গিয়াস উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। মুঠোফোনযোগে তিনি সংক্ষিপ্তভাবে বলেন, ‘আমি এখন চট্টগ্রামে নেই এবং এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’














