চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে র্যাব ও পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্পে পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। হামলার আগে অন্তত পাঁচটি স্থানে এক্সকাভেটর দিয়ে রাস্তা কেটে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয় পুরো এলাকা। পরে গভীর রাতে অতর্কিতে গুলি চালানো হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাম্প লক্ষ্য করে। পাল্টা গুলিবিনিময়ের একপর্যায়ে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় নির্মাণাধীন র্যাব ক্যাম্পের দেয়াল ও বিভিন্ন অবকাঠামো।
রোববার দিবাগত রাত ১টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত সীতাকুণ্ডের আলীনগর ও জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় থেমে থেমে তীব্র গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এরপর সোমবার সকাল থেকে সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথবাহিনীর ব্যাপক সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়। অভিযানে সন্দেহভাজন অন্তত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে।
ঘটনাস্থলে যান চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান ও চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।
র্যাব সূত্র জানায়, হামলার আগে রাত ১০টার পর থেকেই সন্ত্রাসীরা এক্সকাভেটর দিয়ে বিভিন্ন স্থানে রাস্তা কাটতে শুরু করে। অন্তত পাঁচটি পয়েন্টে প্রায় চার ফুট গভীর গর্ত তৈরি করে সড়ক চলাচল অচল করে দেওয়া হয়, যাতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারে।
র্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ‘এটি ছিল পরিকল্পিত হামলা। সন্ত্রাসীরা আগে থেকেই রাস্তা কেটে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করে। পরে ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। আমাদের সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছোড়ে। হামলাকারীরা ভারী অস্ত্র ব্যবহার করেছে। র্যাবের নির্মাণাধীন ক্যাম্পে বুলডোজার চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়েছে। যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
র্যাবের দাবি, ‘সন্ত্রাসী’ ইয়াসিন বাহিনীর সদস্যরা হামলার সঙ্গে জড়িত। তবে হামলার পর অন্ধকার ও পাহাড়ি দুর্গম পথ ব্যবহার করে অনেক সন্ত্রাসী পালিয়ে যায়।
র্যাব-৭ এর ডেপুটি সহকারী পরিচালক কামাল হোসাইন বলেন, ‘রাস্তা কেটে পুরো এলাকা অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। গাড়ি তো দূরের কথা, মোটরসাইকেলও ঢুকতে পারছিল না। পরে সদস্যরা পায়ে হেঁটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান চালান।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, রাতের বৃষ্টিকে কাজে লাগিয়ে পাহাড়ি ঝোপঝাড়ের আড়াল দিয়ে হামলাকারীরা ক্যাম্পের খুব কাছে চলে আসে। হঠাৎ চারদিক থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিতে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, ‘হামলার আগে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন স্থানে রাস্তা কেটে ফেলা হয়েছিল। ফলে আমাদের গাড়ি সামনে এগোতে পারেনি। সদস্যরা পায়ে হেঁটে অভিযান চালায়। রাতভর গুলিবর্ষণের পর ভোরে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। সন্দেহভাজন বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। কারা এই হামলার সঙ্গে জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এলাকায় প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে। গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্যের যৌথ অভিযানে এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপর সেখানে পুলিশ ও র্যাবের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয় সরকার।
এর অংশ হিসেবে আলীনগরে নির্মাণাধীন র্যাব ক্যাম্পে এই হামলার ঘটনা ঘটল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের বড় প্রকল্প ও নিরাপত্তা অবকাঠামো স্থাপনের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে একটি গোষ্ঠী এলাকায় অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।
এদিকে আগামী ৩১ মে জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনে আসার কথা রয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ-এর। প্রশাসন রোববার সকালে সফরসূচি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাতে এই হামলার ঘটনা ঘটে।














