২১ অক্টোবর ২০২৬

দারিদ্র্য জয় করে পারজানার গোল্ডেন জিপিএ-৫, স্বপ্ন এখন ডাক্তার হওয়ার

ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় ও স্বপ্ন থাকলে দারিদ্র্য কোনো বাধা হতে পারে না— সীতাকুণ্ডের মেধাবী শিক্ষার্থী পারজানা আক্তার যেন তারই অনন্য উদাহরণ। অভাব-অনটন, আর্থিক সংকট ও নানা প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে সদ্য প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে।

সীতাকুণ্ড বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কৃতি শিক্ষার্থী পারজানার এ সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখার প্রতি তার ছিল গভীর মনোযোগ। অষ্টম শ্রেণির জেএসসি পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ অর্জন করেছিল সে। পড়াশোনার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও ছিল তার সক্রিয় অংশগ্রহণ।

দরিদ্র কৃষক বাবা নুরুল ইসলাম ও মা খতিজা বেগমের সংসারে বেড়ে ওঠা পারজানার। অভাব-অনটন ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। এমনকি মেয়ের স্কুলের মাসিক বেতন পরিশোধ করতেও বাবাকে হিমশিম খেতে হতো। নামীদামি কোচিং বা প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্যও ছিল না পরিবারের।

নবম শ্রেণিতে ওঠার পর বিজ্ঞান বিভাগের জটিল বিষয়গুলো নিয়ে কিছুটা ভীতি তৈরি হলেও বড় ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয় পারজানা। একটি গণমাধ্যমে স্বল্প বেতনে চাকরি করা সাংবাদিক বড় ভাইই ছিলেন তার পড়াশোনার অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা।

কোচিং কিংবা প্রাইভেট পড়ার সুযোগ না থাকলেও দমে যায়নি পারজানা। বাড়িতেই নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সহযোগিতা নিয়েছে। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করেও নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকত সে। ক্লাসের পড়া মনোযোগ দিয়ে লিখে নিয়ে অনেক সময় পায়ে হেঁটেই বাড়ি ফিরত।

সীতাকুণ্ড বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক গোলাম রাব্বানি বলেন, ‘পারজানা ছিল ক্লাসের অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও নিয়মিত শিক্ষার্থী। পড়ালেখায় আন্তরিকতা এবং শিষ্টাচারের কারণে শিক্ষক ও সহপাঠী সবারই প্রিয় ছিল সে।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিদারুল আলম বলেন, ‘ক্লাসে মনোযোগী হওয়া এবং শিক্ষকদের নির্দেশনা মেনে চললে ভালো ফলাফল করা সম্ভব— পারজানা তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। আমি তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি।’

ফল প্রকাশের দিন পারজানার মনে ছিল কিছুটা শঙ্কা। পাস করার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস থাকলেও কাঙ্ক্ষিত গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়া নিয়ে দ্বিধা ছিল। শিক্ষক ফলাফলের শিট পাঠানোর পর প্রথমে নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না সে। পরে বিস্তারিত ফলাফল দেখে নিশ্চিত হয়, তার দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য সত্যিই ধরা দিয়েছে।

সাফল্যের খবর জানার পর আনন্দে চোখ ভিজে ওঠে পারজানার। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও নানা প্রতিকূলতার পর কাঙ্ক্ষিত ফলাফল যেন তার কাছে হয়ে ওঠে এক আবেগঘন মুহূর্ত।

পারজানার বাবা নুরুল ইসলাম ও মা খতিজা বেগম জানান, মেয়ের এখন একটাই স্বপ্ন— ভবিষ্যতে এমবিবিএস ডাক্তার হয়ে সমাজের অবহেলিত মানুষের সেবা করা এবং বাবা-মায়ের ত্যাগকে সার্থক করা। তার এই সাফল্যের পেছনে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবদানও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তারা।

দারিদ্র্যকে জয় করে পারজানার এমন অর্জনে আনন্দিত তার পরিবার, শিক্ষক ও সহপাঠীরা। সীতাকুণ্ডবাসীর মধ্যেও তৈরি হয়েছে গর্বের অনুভূতি। এখন পারজানার প্রত্যাশা, তার স্বপ্নের পথে যেন আর্থিক সংকট বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ