চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ব্যস্ততম পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে দিবালোকে যুবদল নেতা মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদ (৪৫) হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা দায়ের হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। একই সঙ্গে চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ সম্পর্কেও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো তথ্য প্রকাশ করতে পারেনি পুলিশ। ফলে জনমনে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে দ্রুত হত্যার রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন নিহতের স্বজন, রাজনৈতিক সহকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
তবে পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া পাঁচজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা রাউজানের বাসিন্দা বলে জানিয়েছে পুলিশ। চিহ্নিত হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক দল মাঠে কাজ করছে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ, পরিকল্পনাকারী এবং প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীদের শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
গত শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারের মোড়ে আশরাফিয়া ফার্মেসির সামনে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদ। তিনি রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বেতাগী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা এবং মৃত আব্দুল খালেক চৌধুরীর ছেলে। তিনি বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ পিয়ারুল হক চৌধুরী স্বপন ও ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক নিজামুল হক চৌধুরী তপনের ছোট ভাই। পাশাপাশি তিনি রাঙ্গুনিয়া আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
রবিবার বিকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে তার মরদেহ গ্রামের বাড়ি রাঙ্গুনিয়ার চম্পাতলী ঈদগাহ ময়দানে নেওয়া হয়। সেখানে বিকাল সাড়ে ৫টায় জানাজা শেষে সামাজিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। জানাজায় বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও অঙ্গসংগঠনের কেন্দ্রীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মী ছাড়াও বিপুলসংখ্যক স্থানীয় মানুষ অংশ নেন। এ সময় নেতাকর্মীরা হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ উদঘাটন এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টা পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তিনজন অস্ত্রধারী আল মক্কা কমপ্লেক্সের সামনে একটি ফার্মেসির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মাসুদকে লক্ষ্য করে গুলি করে। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে উত্তর পাশে হাফেজ বজলুল রহমান সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে আরও দুই ব্যক্তি অস্ত্র হাতে নেমে ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে আসে। এরপর প্রথমে গুলি করা তিন ব্যক্তি পুনরায় তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। পরে তারা অস্ত্র উঁচিয়ে ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে সিএনজিতে উঠে কদলপুরের দিকে চলে যায়।
এ ঘটনায় বাজারজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ব্যবসায়ীরা মুহূর্তের মধ্যে দোকানপাট বন্ধ করে দেন এবং ক্রেতা-সাধারণ দিকবিদিক ছুটতে থাকেন। আরেকটি ফুটেজে দেখা যায়, লোকজন যখন প্রাণভয়ে ছুটাছুটি করছে, তখন এক যুবক নিহত মাসুদের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে নিয়ে চলে যায়।
ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৪০০ মিটার পশ্চিমে রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপারের কার্যালয় এবং প্রায় ৭০০ মিটার পূর্বে চুয়েট পুলিশ ফাঁড়ি অবস্থিত। এছাড়া যেই সড়ক দিয়ে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়, সেই পথে নিয়মিত পুলিশি তল্লাশিচৌকিও রয়েছে। তারপরও প্রকাশ্যে এমন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর অস্ত্র উঁচিয়ে হামলাকারীদের নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়াকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
নিহতের বড় ভাই ও বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ পিয়ারুল হক চৌধুরী স্বপন বলেন, ‘কী কারণে আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে, আমরা তা জানি না। কাউকে সন্দেহও করতে পারছি না। তবে সিসিটিভি ফুটেজে যাদের মুখ স্পষ্ট দেখা গেছে, তাদের গ্রেপ্তার করা গেলে হত্যার কারণ ও নেপথ্যের ঘটনা জানা যাবে।’
অপর ভাই ও ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক নিজামুল হক চৌধুরী তপন বলেন, ‘আমার ভাই কোনো সন্ত্রাসী ছিলেন না। তিনি রাজনীতি করতেন। এটি কি তার অপরাধ?’ মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দলীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর নিহতের ঘনিষ্ঠজন ও স্থানীয় অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন। স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ও বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কর্ণফুলী নদীর বালু ব্যবসা, এলাকায় প্রভাব বিস্তার এবং আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে তার অবস্থান- এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘এখন পর্যন্ত হত্যার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ পাওয়া যায়নি। তবে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পাঁচজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। গোয়েন্দা সংস্থাসহ পুলিশের একাধিক দল হত্যার কারণ উদঘাটনে কাজ করছে। নিহতের দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের মামলা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।’
পাহাড়তলী চৌমুহনী ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মাবুদ খান বলেন, ‘গত সরকারের পতনের পর বাজারে কোনো ধরনের অরাজকতা ছিল না। হঠাৎ এমন ঘটনায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এই ঘটনার পর ঘটনাস্থলে পাশের এক চায়ের দোকানদার জাগের হোসেনকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। তিনি বাজারের সবচেয়ে নিরহ ও সহজ সরল মানুষ। আমরা চাই প্রকৃত অপরাধীদের বিচার হোক। তবে কোনো নিরীহ ব্যবসায়ী বা সাধারণ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন।’
রবিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এখনো ভুক্তভোগী পরিবার মামলা করতে আসেনি। আমরা চিহ্নিত হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছি। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক এক চায়ের দোকানদারকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে তার গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় মামলা না থাকলেও তাকে ৫৪ ধারায় আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।’
স্থানীয় সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে রাউজানে অন্তত ১৮টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনার অনেকগুলোর মূল আসামি এখনো অধরা। যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে জামিনে মুক্ত হয়ে এলাকায় চলাফেরা করছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।














