চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশে একটি ভাড়া বাসায় ঢুকে প্রায় ২৫ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার চুরির ঘটনায় মামলা হওয়ার এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার। আসামি শনাক্ত, গ্রেপ্তার কিংবা চুরি যাওয়া স্বর্ণ উদ্ধারের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান কোনো সাফল্য নেই।
২০২৫ সালের ১২ মে পাঁচলাইশ মডেল থানাধীন বিবিরহাট খ্রিষ্টান কবরস্থানের পাশে হামিদ ভিলার ২৬৪৭/বি নম্বর বাসার চতুর্থ তলায় এ চুরির ঘটনা ঘটে। পরে ১৫ মে পাঁচলাইশ মডেল থানায় মামলা করেন বাসাটির বাসিন্দা ডা. মো. ফুয়াদ হাসান। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন বলে জানিয়েছেন পাঁচলাইশ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহেদুল ইসলাম।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ফুয়াদ হাসানের বাবা বাসার দরজা-জানালা বন্ধ করে কর্মস্থলে যান। দুপুর আড়াইটার দিকে পাঁচতলার এক প্রতিবেশী মোবাইল ফোনে জানালে তিনি বাসায় ফিরে দেখতে পান, মূল দরজার তালা খোলা। ভেতরে ঢুকে বিভিন্ন আসবাবপত্র এলোমেলো এবং মায়ের বেডরুমের আলমারি ও অন্য কক্ষের ওয়ারড্রবের তালা ভাঙা অবস্থায় দেখতে পান তিনি।
পরে খোঁজ করে পরিবারের সদস্যদের ব্যবহৃত স্বর্ণালংকার না পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হন তারা। এজাহারে মোট ১৬ ভরি ৩ আনা স্বর্ণালংকারের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এর আনুমানিক মূল্য ২৫ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়।
এজাহারে বলা হয়েছে, চুরি যাওয়া স্বর্ণের মধ্যে ছিল মায়ের কণ্ঠহার, গলার সিক হার, হাতের বালা, গলার চেইন, কানের রিং, আংটি ও নাকফুল। একই সঙ্গে ফুয়াদ হাসানের দক্ষিণ কোরিয়া প্রবাসী বড় বোনের ব্যবহৃত চেইন, বালা ও কানের দুলও ছিল।
তবে ঘটনার পরপরই থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন বলে দাবি ভুক্তভোগী পরিবারের। পরবর্তী মামলার এজাহারে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের দেওয়া প্রাথমিক অভিযোগে কয়েকজনকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছিল। তাদের মধ্যে বাসায় কাজ করতে আসা এক নারী গৃহকর্মী এবং বাসার ফ্রিজের কাজ করতে আসা দুই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, ঘটনার কয়েক দিন আগে ওই দুই ব্যক্তি বাসার ফ্রিজের কাজ করেছিলেন এবং পরিবারের সদস্যরা কখন বাসায় থাকেন না, সে বিষয়ে তারা অবগত ছিলেন বলে পরিবারের ধারণা। ঘটনার দিনও একজন নারী ওই ভবনে কাজ করতে এসেছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া ঘটনার দিন দুপুর ১টা ২৪ মিনিট থেকে ১টা ৫২ মিনিটের মধ্যে দুই অজ্ঞাত ব্যক্তি একটি সুজুকি মোটরসাইকেলে করে বাসার সামনে আসে এবং তাদের একজন বাসায় প্রবেশ করে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
তবে এসব তথ্য ভুক্তভোগী পরিবারের প্রাথমিক অভিযোগ ও সন্দেহের ভিত্তিতে দেওয়া। তাদের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো তথ্য মামলার নথিতে নেই। ফলে তদন্তের মাধ্যমে এসব সন্দেহের সত্যতা যাচাই করাই এখন পুলিশের দায়িত্ব।
মামলার বাদী মো. ফুয়াদ হাসান অভিযোগ করেন, ঘটনার শুরুতেই পুলিশ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করলে এতদিনে চোর শনাক্ত, গ্রেপ্তার এবং চুরি যাওয়া স্বর্ণ উদ্ধার করা সম্ভব হতো।
তিনি আরো বলেন, “ঘটনার সময় কারা কোথা থেকে এসেছিল, তার ভিডিও ফুটেজও ছিল। যাদের আমরা সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করেছিলাম, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাদের মোবাইল ফোনের যোগাযোগের তথ্য খতিয়ে দেখা হলে বিষয়টি অনেকটা স্পষ্ট হতে পারত।”
ফুয়াদের প্রশ্ন, “কাদের ডাকে বা কীভাবে শহরের একটি পাঁচতলা ভবনে ঢুকে চোরেরা ২৫ লাখ টাকার স্বর্ণ নিয়ে গেল—সেটি কি তদন্তে বের করা খুব কঠিন?”
মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন পাঁচলাইশ মডেল থানার এসআই মো. তামজিদ হোসাইন। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন এসআই শওকত ইমন। মামলা নম্বর: ০৯/৮৪, তারিখ ১৫ মে ২০২৫। ঘটনা ঘটে ১২ মে ২০২৫ সকাল হতে দুপুরের মধ্যে।
এসআই শওকত ইমন বলেন, মামলাটি বর্তমানে তিনি তদন্ত করছেন। তবে এখন পর্যন্ত বলার মতো কোনো উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তদন্ত চলমান রয়েছে।
পাঁচলাইশ মডেল থানার ওসি মো. জাহেদুল ইসলামও মামলাটি তদন্তাধীন থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
একটি আবাসিক বাসায় দিনের বেলায় তালা ভেঙে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার চুরির ঘটনায় মামলা হওয়ার পরও এক বছরের বেশি সময়েও যদি সন্দেহভাজনদের বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকে, তাহলে তদন্তের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
বিশেষ করে ঘটনার সময়সীমা, ভবনে প্রবেশ ও বের হওয়ার সম্ভাব্য পথ, ভবনের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, মোটরসাইকেলে আসা ব্যক্তিদের পরিচয় এবং ভুক্তভোগী পরিবারের দেওয়া সন্দেহের তথ্য—এসব বিষয় তদন্তে কতটা গুরুত্ব পেয়েছে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পরপরই তারা পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। সে সময় দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমে নানা সীমাবদ্ধতা ছিল বলেও তারা উল্লেখ করেন।
তবে এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরও মামলাটির দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় পরিবারটির মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রায় ২৫ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার হারানোর পর একটি পরিবার এক বছরের বেশি সময় ধরে যদি তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় থাকে, তাহলে মামলাটির তদন্তে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন কি না— এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।
এখন পরিবারের প্রত্যাশা, তদন্তে সম্ভাব্য সব তথ্য-প্রমাণ নতুন করে যাচাই করে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা, তাদের আইনের আওতায় আনা এবং সম্ভব হলে চুরি যাওয়া স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা। একই সঙ্গে প্রাথমিক অভিযোগে উল্লেখ করা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্তে কী পাওয়া গেছে, সেটিও পরিষ্কার করা প্রয়োজন।














