২৩ অক্টোবর ২০২৬

বন্যার পানি কমছে, ভেসে উঠছে ক্ষতচিহ্ন

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকায় ভেঙে পড়েছে বসতঘর, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক, সেতু ও কালভার্ট। ডুবে নষ্ট হয়েছে হাজার হাজার একর ফসলি জমি, ভেসে গেছে মাছের ঘের ও পুকুরের মাছ। অনেক এলাকায় পানি নেমে গেলেও সড়ক যোগাযোগ এখনও স্বাভাবিক হয়নি।

বান্দরবানের শীলক খালের উত্তর পাড়ের বাসিন্দা মোহাম্মদ পারভেজ জানান, পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত বাড়তে দেখে তিনি ঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যান। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্রোতে তাঁর পুরো বসতঘর ভেসে গিয়ে পাশের বেইলি সেতুর ওপর আছড়ে পড়ে। ঘরের আসবাবপত্র, খাদ্যশস্যসহ প্রায় সবকিছুই পানিতে হারিয়ে গেছে।

চট্টগ্রামের বাঁশখালী, লোহাগাড়া ও সাতকানিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায়ও অসংখ্য কাঁচা ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরে অনেক পরিবার ঘরবাড়িকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে দেখছে।

যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধাক্কা
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, কক্সবাজারে বন্যায় প্রায় ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৯০ কোটি টাকা।

বান্দরবানে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় প্রায় ১৫১ কিলোমিটার সড়ক ও চারটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ৪৭ স্থানে পাহাড়ধস এবং ২১ স্থানে গাছ উপড়ে পড়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো মেরামতে জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ৭ কোটি এবং টেকসই পুনর্নির্মাণে প্রায় ৪০ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সড়ক বিভাগ।

রাঙামাটিতে অন্তত ১০২ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খাগড়াছড়ির নয় উপজেলায় ২৫টি ছোট-বড় সড়ক ক্ষতির মুখে পড়েছে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় প্রায় ৩০ কিলোমিটার সড়ক ও ১৭টি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাঁশখালীতে প্রায় ১১০ কিলোমিটার সড়ক, ২৫টি কালভার্ট ও দুটি সেতুর ক্ষতি হয়েছে।

কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদে বিপুল লোকসান
বন্যার সবচেয়ে বড় আঘাত পড়েছে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে। কক্সবাজারে ১০ হাজার ৪০১ একর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এতে অন্তত ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পাশাপাশি প্রায় ২ হাজার ৪৪০ হেক্টর পুকুর ও চিংড়িঘেরের মাছ ভেসে গেছে।

লোহাগাড়ায় প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কৃষকের প্রায় ৬০ কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে। এছাড়া ১ হাজার ৬২০টি পুকুর ও মাছের খামার পানিতে তলিয়ে প্রায় ৮ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। প্রাণিসম্পদ খাতেও প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

রাঙামাটির ১০ উপজেলায় প্রায় ৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খাগড়াছড়িতে প্রায় ১ হাজার ৩১ হেক্টর এবং বান্দরবানে প্রায় ৫ হাজার ২৬০ একর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।

আশ্রয়কেন্দ্রে এখনও ১০ হাজারের বেশি মানুষ
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫৯টি উপজেলার ৩৬৮টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা চলমান বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৪ জনে পৌঁছেছে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ইতোমধ্যে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, চাল ও শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে বন্যাকবলিত সাত জেলার ৩২৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে এখনও ১০ হাজার ৮৫৪ জন মানুষ অবস্থান করছেন। পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন