২৩ অক্টোবর ২০২৬

মায়ের আকুতি শুনলেন না নার্স

মায়ের ইনজেকশন নবজাতক শিশুকে, মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই— প্রশ্নের মুখে সিএসসিআর

মায়ের চোখের সামনেই তার সদ্যোজাত সন্তানের শরীরে পুশ করা হলো মায়ের জন্য আনা ইনজেকশন! ভুলটি বুঝতে পেরে মা বারবার নিষেধ করলেন— ‘এটা আমার ইনজেকশন, আমার বাচ্চাকে দেবেন না।’ কিন্তু সেই আকুতিও থামাতে পারেনি নার্সকে। মায়ের আপত্তি উপেক্ষা করেই নবজাতকের শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় ইনজেকশন। এরপরই অসুস্থ হয়ে পড়ে নবজাতক শিশুটি। শুরু হয় দৌড়ঝাঁপ। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে তাকে ভর্তি করা হয় এনআইসিইউতে। এখন একদিকে মায়ের চোখে পানি, অন্যদিকে হাসপাতালের বিছানায় নিথর হয়ে পড়ে থাকা শিশুকে ঘিরে স্বজনদের উৎকণ্ঠা— সন্তানটি শেষ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে মায়ের কোলে ফিরবে তো?

চট্টগ্রাম নগরীর সিএসসিআর হাসপাতালে গত শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, মায়ের জন্য নির্ধারিত ‘রোফাইলাক ৩০০ এমজি’ ইনজেকশন ভুল করে নবজাতককে পুশ করা হয়েছে। আরও গুরুতর অভিযোগ, ভুলটি মা নিজেই ধরিয়ে দেওয়ার পরও তার নিষেধ উপেক্ষা করেন দায়িত্বে থাকা নার্স।

পরিবার ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সন্তান জন্ম নেওয়ার পর শিশুটির মায়ের জন্য ‘রোফাইলাক ৩০০ এমজি’ ইনজেকশন আনা হয়। মাত্র দুই মাস আগে হাসপাতালে যোগ দেওয়া এক নার্স ওই ইনজেকশন নিয়ে নবজাতকের কাছে যান। ইনজেকশনটি দেখেই বিষয়টি বুঝতে পারেন শিশুটির মা। সঙ্গে সঙ্গে তিনি নার্সকে বাধা দিয়ে বলেন, ‘এটা আমার ইনজেকশন, আমার বাচ্চাকে দেবেন না।’

পরিবারের দাবি, মায়ের এমন স্পষ্ট আপত্তির পরও নার্স থামেননি। বরং উল্টো তাকে ধমক দিয়ে বলেন, ‘আপনি কি আমার ডিউটি করেন?’ এরপর মায়ের নিষেধ উপেক্ষা করেই নবজাতকের শরীরে ইনজেকশনটি পুশ করা হয়।

ইনজেকশন দেওয়ার পরপরই নবজাতকের শারীরিক অবস্থার অবনতি শুরু হয় বলে পরিবারের দাবি। দ্রুত তাকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) নেওয়া হয়। বর্তমানে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছে শিশুটি। পরিবারের ভাষ্য, প্রতি ১২ ঘণ্টা পরপর তার রক্ত পরীক্ষা করা হচ্ছে।

ভুল ইনজেকশন পুশের কথা স্বীকার হাসপাতালের
ঘটনার খবর পেয়ে ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশ হাসপাতালে যায়। পাঁচলাইশ থানার এসআই কামরুজ্জামান জানান, পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছে। প্রাথমিক তদন্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকেরা ভুল ইনজেকশন পুশ করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

সিএসসিআর হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ডা. মোর্শেদুল করিম চৌধুরীও ঘটনাটি ভুলবশত ঘটেছে বলে স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, দুজন কনসালটেন্ট ডেকে নবজাতককে পরীক্ষা করানো হয়েছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী শিশুটিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

প্রশ্নের মুখে পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা
একজন রোগীর জন্য নির্ধারিত ওষুধ কীভাবে অন্য রোগীর কাছে গেল— এমন প্রশ্নের পাশাপাশি আরও বড় প্রশ্ন, ভুলটি যখন শিশুটির মা নিজেই শনাক্ত করে নার্সকে সতর্ক করেছিলেন, তখনও কীভাবে তা ঠেকানো গেল না?

বিশেষ করে সদ্যোজাত শিশুর ক্ষেত্রে রোগীর পরিচয় নিশ্চিত করা, প্রেসক্রিপশন যাচাই, ওষুধের নাম ও মাত্রা মিলিয়ে দেখা এবং ইনজেকশন দেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ধাপ অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই ঘটনায় এসব প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সচেতন মহলের মতে, একজন রোগীর ওষুধ অন্য রোগীর শরীরে চলে যাওয়া নিছক একটি ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে মায়ের সরাসরি আপত্তির পরও যদি ইনজেকশন দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে নার্সিং তদারকি ও রোগী নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও তদন্ত প্রয়োজন।

আগেও জরিমানার মুখে পড়েছিল হাসপাতাল
এর আগে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও র‌্যাবের অভিযানে সিএসসিআর হাসপাতালে মেয়াদোত্তীর্ণ সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট ও ফার্মেসির লাইসেন্স-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।

আর এখন নবজাতকের শরীরে ভুল ইনজেকশন পুশের মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠায় হাসপাতালটির সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও রোগী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এদিকে এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন শিশুটিকে ঘিরে উৎকণ্ঠার প্রহর গুনছে পরিবার। মায়ের কোলে সন্তান ফিরে আসবে— এখন এটাই স্বজনদের একমাত্র প্রার্থনা। একই সঙ্গে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কঠোর রোগী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

আরও পড়ুন