‘ভালো হয়ে যাও মাসুদ’— তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের এই মন্তব্যে একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত হয়ে ওঠা বিআরটিএ কর্মকর্তা মো. মাসুদ আলমকে এবার চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় বদলি করা হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, মার্চে একই কর্মকর্তাকে ঢাকায় বদলির আদেশ দেওয়ার পর সেটি কার্যকর হলো না কেন? আর পাঁচ মাস পর নতুন করে দেওয়া বদলি আদেশই বা এবার কতটা কার্যকর হবে?
গত ৩১ আগস্ট বিআরটিএ চেয়ারম্যানের কার্যালয় থেকে জারি করা অফিস আদেশে মো. মাসুদ আলমকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় অফিসের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) পদ থেকে ঢাকা বিভাগীয় অফিসের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) পদে বদলি করা হয়েছে। জনস্বার্থে জারি করা আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে গত মার্চে তৈরি হওয়া বদলি-রহস্যেরও যেন নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে।
এক আদেশ, তারপর বাতিল
বিআরটিএর অফিস আদেশ অনুযায়ী, গত ৭ মার্চ চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. মাসুদ আলমকে সদর কার্যালয়ের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) পদে বদলি করা হয়েছিল।
একই আদেশে সদর কার্যালয়ের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহকে পরিচালক (রোড সেফটি) পদে দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু সেই আদেশ আর বাস্তবায়ন হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আদেশটি পরে বাতিল হয়ে যায়।
কেন একটি জারি করা বদলি আদেশ কার্যকর হওয়ার আগেই বাতিল করা হলো, সে বিষয়ে বিআরটিএর পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে তখনই সংস্থাটির ভেতরে আলোচনা শুরু হয়। পরে ৩১ আগস্ট নতুন আদেশে আবারও মাসুদ আলমকে ঢাকায় বদলি করা হলো।
অর্থাৎ, মার্চে ঢাকায় যাওয়ার আদেশ, এরপর সেই আদেশের বাস্তবায়ন না হওয়া, আর আগস্টে আবার ঢাকায় বদলি— ঘটনাপ্রবাহটি এখন নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এবারও কি বদলির আদেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে?
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউ কেউ বলছেন, বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে বিআরটিএতে দীর্ঘদিন ধরেই স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংস্থাটির এক কর্মকর্তা বলেন, কোনো বদলি আদেশ জারি হওয়ার পর প্রভাবশালী মহলের তৎপরতার কারণে কখনো কখনো সেই আদেশ বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তার দাবি, ‘মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে’ বদলি-পদায়নের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের অভিযোগও রয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বিআরটিএর অধিকাংশ বদলি ও পদায়নের অফিস আদেশ নিয়মিতভাবে ওয়েবসাইটে প্রকাশ না করায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্ন তৈরি হয়।
বদলি-পদায়নে বড় রদবদল
৩১ আগস্টের একই অফিস আদেশে বিআরটিএর আরও কয়েকজন কর্মকর্তার দায়িত্বে পরিবর্তন আনা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় অফিসের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. মাসুদ আলমের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন ঢাকা বিভাগীয় অফিসের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) শফিকুজ্জামান ভূঞা।
খুলনা বিভাগীয় অফিসের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. জিয়াউর রহমানকে সদর কার্যালয়ের পরিচালক (রোড সেফটি) পদে বদলি করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে বরিশাল বিভাগীয় অফিসের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং)-এর অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া খুলনা বিভাগীয় অফিসের উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) তানভীর আহমেদকে নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি ওই বিভাগের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং)-এর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
‘ভাইরাল মাসুদ’ হওয়ার গল্প
মাসুদ আলমের নাম প্রথম ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে ২০১৭ সালে। সে সময় বিআরটিএর মিরপুর কার্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে সেবাগ্রহীতাদের বিভিন্ন অভিযোগের মুখে তাকে উদ্দেশ করে ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘ভালো হয়ে যাও মাসুদ।’
ওই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মাসুদ আলম ‘ভাইরাল মাসুদ’ নামে পরিচিতি পান। পরবর্তী বছরগুলোতেও বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে তাকে ঘিরে ওই ঘটনার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।
এরপর ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ তিনি বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) হিসেবে যোগ দেন। এর আগে তিনি খুলনা বিভাগীয় অফিসের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চট্টগ্রামে দুই বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালনের পর এবার তাকে পাঠানো হচ্ছে ঢাকায়।
‘সরকার বদলায়, সংস্কৃতি বদলায় না’
বিআরটিএর বদলি-পদায়ন প্রসঙ্গে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিআরটিএতে বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি ও নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে তারা একাধিকবার স্মারকলিপি দিয়েছেন। কিন্তু এখনও কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা একই গ্রেডের মধ্যে বারবার গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাচ্ছেন।
তার ভাষায়, ‘সরকার বদলায়, কিন্তু বিআরটিএর এই সংস্কৃতি বদলায় না।’
জবাব মেলেনি মাসুদের
সাম্প্রতিক বদলি এবং মার্চের বদলি আদেশ কার্যকর না হওয়ার বিষয়ে মো. মাসুদ আলমের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও পরিচয় জানার পর তিনি আর কোনো উত্তর দেননি। ফলে এখন প্রশ্ন— মার্চের বদলি আদেশ কেন কার্যকর হলো না, আর আগস্টের নতুন আদেশটি এবার বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়— তার উত্তর মিলবে কি?














