২১ অক্টোবর ২০২৬

রাঙামাটি-বান্দরবানে বন্যার পানি নামছে, আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়ছে মানুষ

টানা বন্যার পর রাঙামাটি ও বান্দরবানে পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। পানি কমতে শুরু করায় দুই জেলাতেই আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরছেন দুর্গত মানুষ। তবে রাঙামাটিতে এখনো এক হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দী রয়েছে। অন্যদিকে বান্দরবানে অধিকাংশ এলাকা থেকে পানি নেমে গেলেও পাহাড়ধস ও ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের কারণে সব রুটে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি।

রাঙামাটিতে বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্রও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি, সবজিখেত, পেঁপে বাগান এবং আমনের বীজতলা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। দুর্গতদের অভিযোগ, সরকারি ত্রাণ বিতরণ চললেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল।

বরকল উপজেলার কুকিছড়া এলাকার বাসিন্দা সোনা রঞ্জন চাকমা জানান, অনেক এলাকায় পানি কমলেও তাঁদের এলাকার বাড়িঘর এখনো পানিতে তলিয়ে রয়েছে। কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে, কেউ স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। পর্যাপ্ত ত্রাণ না পাওয়ায় দুর্ভোগ বাড়ছে।

একই উপজেলার পেঁপে চাষি ধর্মেশ চাকমা বলেন, দেড় লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ৫০০টি পেঁপেগাছ লাগিয়েছিলেন। প্রতিটি গাছে ফল এসেছিল। বাজারে তোলার আগেই বন্যার পানিতে পুরো বাগান নষ্ট হয়ে গেছে।

ভূষণছড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা জগৎময় চাকমাও একই ধরনের ক্ষতির কথা জানান। তিনি বলেন, প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যয়ে ৮৭২টি উন্নত জাতের পেঁপের চারা রোপণ করেছিলেন, কিন্তু বন্যায় সব নষ্ট হয়ে গেছে।

বরকল উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম জানান, শুধু ভূষণছড়া ইউনিয়নেই ৪৪টি গ্রামের প্রায় চার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

বিলাইছড়ি উপজেলার অনেক এলাকাও এখনো পানির নিচে রয়েছে। বিশেষ করে ফারুয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত। উপজেলা প্রশাসন জানায়, দুর্গতদের মধ্যে ত্রাণ, চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।

রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রুহুল আমিন জানান, বর্তমানে জেলার ৫০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ হাজার ৬৩৭ জন মানুষ অবস্থান করছেন। এখনো ১ হাজার ৪৪টি পরিবার পানিবন্দী রয়েছে। এছাড়া অতিবৃষ্টির কারণে জেলার সাতটি উপজেলায় ১৩১টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে।

অন্যদিকে বান্দরবানে বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় মানুষ ধীরে ধীরে ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে বাড়িঘর ও রাস্তাঘাট কাদায় ভরে যাওয়ায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে।

উজানীপাড়া এলাকার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন জানান, আশ্রয়কেন্দ্র থেকে এসে তিনি ঘর পরিষ্কারের কাজ করছেন। সবকিছু স্বাভাবিক হতে আরও কিছু সময় লাগবে।

বান্দরবান সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা হনুফা বেগম বলেন, পানি নেমে গেলেও সাঙ্গু নদীর পানি আবার বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় এখনই বাড়ি ফিরছেন না। পরিস্থিতি দেখে আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়বেন।

জেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম জানান, বেশির ভাগ সড়ক থেকে পানি নেমে গেছে। তবে পাহাড়ধসের কারণে অনেক স্থানে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। মঙ্গলবার থেকে অধিকাংশ রুটে বাস চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হচ্ছে। তবে শীলক খালের ভেসে যাওয়া বেইলি সেতু পুনর্নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত বান্দরবান-চন্দ্রঘোনা-রাঙামাটি সড়কে বাস চলাচল সম্ভব হবে না।

বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এস এম হাসান জানান, সরকারি উদ্যোগে এ পর্যন্ত সাড়ে তিন হাজার মানুষকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে। তিনি বলেন, পানি নেমে যাওয়ায় জেলার সার্বিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে, তবে পুনর্বাসন কার্যক্রম এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ