২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালকে ঘিরে উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, তখন মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি আলোচনায় উঠে এসেছে রেফারিং, লিওনেল মেসিকে থামানোর কৌশল এবং আর্জেন্টিনার বিপক্ষে স্পেনের পরিকল্পনা। শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচের আগে এসব বিষয়েই খোলামেলা কথা বলেছেন স্পেনের প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে।
বিশ্বকাপজুড়ে রেফারিং নিয়ে বিতর্ক ছিল অন্যতম আলোচিত বিষয়। একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, ভিএআরের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন এবং বিভিন্ন ম্যাচে রেফারিদের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন কোচ, ফুটবলার ও সমর্থকরা। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার কয়েকটি ম্যাচে রেফারিং নিয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও ওঠে।
এমন প্রেক্ষাপটে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালের আগে রেফারিং প্রসঙ্গে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন দে লা ফুয়েন্তে। আগামী রোববার (বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ১টা) যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফাইনালের আগে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম স্পোর্ত-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ম্যাচ পরিচালনায় কঠোর নিরপেক্ষতার আহ্বান জানান। ফাইনালটি পরিচালনা করবেন স্লোভেনিয়ার অভিজ্ঞ রেফারি স্লাভকো ভিনচিক, যিনি ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও সৌদি আরবের ম্যাচও পরিচালনা করেছিলেন।
রেফারিং নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্পেন কোচ বলেন, ‘রেফারি মাঠে কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখাতে পারেন না এবং নিয়ম ভাঙার সুযোগ দিতে পারেন না। ফুটবলের বৈধতার যে সীমারেখা আছে, তা কোনোভাবেই অতিক্রম করতে দেওয়া যাবে না।’
তবে একই সঙ্গে ম্যাচ কর্মকর্তাদের প্রতি নিজের আস্থার কথাও জানান তিনি। দে লা ফুয়েন্তে বলেন, ‘রেফারিদের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। তবে তার চেয়েও বেশি আস্থা আছে আমার দলের ওপর। আমরা জানি, এমন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে কী ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামতে হয়।’
অন্যদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার খেলা নিয়ে সমালোচকদের করা ‘ডার্টি গেম’ বা নোংরা ফুটবলের অভিযোগও নাকচ করে দেন স্পেন কোচ। বরং বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, টানা দুইবারের কোপা আমেরিকা ও ফিনালিসিমা জয়ী দলটির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন তিনি। দে লা ফুয়েন্তের ভাষায়, মাঠে প্রত্যেক দলই নিজেদের কৌশল ব্যবহার করবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি হবে দারুণ একটি ফুটবল ম্যাচ। একই সঙ্গে তিনি আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনিরও প্রশংসা করেন।
ফাইনাল নিয়ে নিজের প্রত্যাশাও তুলে ধরেন স্পেন কোচ। তার মতে, বর্তমান সময়ের দুই সেরা দলের মধ্যকার এই লড়াই হবে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক অসাধারণ উপহার। দুই দলের খেলোয়াড়দের প্রতিভা, সামর্থ্য ও আক্রমণাত্মক মানসিকতার কারণে ম্যাচটি শুরু থেকেই নান্দনিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে বলে বিশ্বাস তার।
তিনি বলেন, ‘এটি অসাধারণ একটি ফুটবল প্রদর্শনী হতে যাচ্ছে। দুটি দলই নিজেদের সেরাটা তুলে ধরার চেষ্টা করবে। আমরা আশা করি, রেফারি ম্যাচের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দক্ষতার সঙ্গে সামলাবেন, যাতে বিশ্বকাপ ফাইনালের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি ম্যাচ উপভোগ করতে পারে ফুটবল বিশ্ব।’
লিওনেল মেসিকে নিয়েও ছিল তার বিশেষ মূল্যায়ন। স্পেন কোচের মতে, মেসি অনন্য এবং বিশ্বের তরুণ ফুটবলারদের জন্য এক আদর্শ। বর্তমান ফর্ম দেখে তার মনে হচ্ছে, মেসি যেন আবার ১৯ বছরের তরুণ হয়ে উঠেছেন।
তবে মেসিকে থামাতে কোনো ব্যক্তিগত পাহারার কৌশল নেবেন না বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দেন দে লা ফুয়েন্তে। অতীতের এক অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, যুব পর্যায়ে কোচিং করানোর সময় একবার মেসিকে ম্যান-মার্কিংয়ে আটকে রাখার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সেই ম্যাচে তার দল চার গোল হজম করেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বিশ্বাস করেন, মেসির মতো ফুটবলারকে একক কোনো ডিফেন্ডার দিয়ে আটকানো সম্ভব নয়। তাই ফাইনালে সম্মিলিত রক্ষণ ও দলগত কৌশলের মাধ্যমে তাকে নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করেছে স্পেন।
নিজ দলের তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালকে নিয়েও আত্মবিশ্বাসী স্পেন কোচ। তিনি নিশ্চিত করেছেন, ইয়ামাল পুরোপুরি ফিট এবং ফাইনালে খেলার জন্য প্রস্তুত। তার ভাষায়, ‘লামিনকে লামিনই থাকতে হবে।’ এত কম বয়সে বিশ্বকাপে তার পারফরম্যান্সকে অসাধারণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
শুধু ইয়ামাল নন, পুরো দল নিয়েই আত্মবিশ্বাসী দে লা ফুয়েন্তে। তার মতে, স্পেনের দলে এমন অনেক ম্যাচজয়ী ফুটবলার আছেন, যাদের দিকেও আর্জেন্টিনাকে সমানভাবে নজর রাখতে হবে।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে তাই রেফারিং, কৌশল, মেসিকে ঘিরে পরিকল্পনা এবং তরুণ ইয়ামালের নেতৃত্বে স্পেনের আক্রমণ— সবকিছু মিলিয়ে ফাইনালটি হতে যাচ্ছে কেবল দুই দলের নয়, দুই ফুটবল দর্শনেরও এক মহারণ।














