ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়; এটি ইতিহাস, আবেগ, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের সম্মিলিত স্বপ্নের এক অপূর্ব মঞ্চ। নব্বই মিনিটের একটি ম্যাচ কখনো কখনো কয়েক দশকের স্মৃতি, গৌরব, বেদনা ও প্রতিশোধের প্রতীক হয়ে ওঠে। আর সেই কারণেই আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মুখোমুখি লড়াই মানেই বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত ও আবেগঘন অধ্যায়গুলোর একটি।
১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ আজও ফুটবল ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড, ২০০২ সালে ইংল্যান্ডের প্রতিশোধ- প্রতিটি ম্যাচই ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে। সেই দীর্ঘ ইতিহাসে ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল যুক্ত করল আরেকটি নতুন অধ্যায়- যার নাম হতে পারে, ‘শেষ সাত মিনিটের মহাকাব্য।’
আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে হাজারো দর্শকের সামনে অনুষ্ঠিত এই লড়াই ছিল দুই ভিন্ন দর্শনের ফুটবলের সংঘর্ষ। একদিকে টমাস টুখেলের শৃঙ্খলাবদ্ধ, সংগঠিত ও দ্রুতগতির ইংল্যান্ড; অন্যদিকে লিওনেল স্কালোনির ধৈর্যশীল, বল দখলভিত্তিক এবং সৃজনশীল আর্জেন্টিনা।
ম্যাচের প্রথম থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, এটি কেবল কৌশলের লড়াই নয়; এটি মানসিক দৃঢ়তা, ধৈর্য এবং মুহূর্তকে কাজে লাগানোর প্রতিযোগিতা। মাঝমাঠে ডেকলান রাইস, জুড বেলিংহ্যাম, এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের দ্বৈরথ ম্যাচটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। দুই দলই আক্রমণের সুযোগ তৈরি করলেও রক্ষণভাগের দৃঢ়তায় প্রথমার্ধ শেষ হয় গোলশূন্য সমতায়।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন ইংল্যান্ডের অ্যান্থনি গর্ডন। ৫৫তম মিনিটে মরগান রজার্সের নিখুঁত পাস থেকে ঠান্ডা মাথার ফিনিশিংয়ে তিনি গোল করে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেন। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, ১৯৬৬ সালের পর আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন বাস্তব হতে চলেছে থ্রি লায়ন্সদের।
কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই- এই খেলায় শেষ বাঁশি বাজার আগে কোনো ফলই নিশ্চিত নয়।
গোল করার পর ইংল্যান্ড ধীরে ধীরে আক্রমণ কমিয়ে রক্ষণ সামলাতেই বেশি মনোযোগ দেয়। প্রথমদিকে সেটি কার্যকর মনে হলেও শেষ পর্যন্ত সেই কৌশলই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। আর্জেন্টিনা ধৈর্য হারায়নি। তারা বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে, সুযোগ খুঁজেছে, আক্রমণের গতি বাড়িয়েছে। আর ঠিক সেই সময় সামনে এসে দাঁড়ান লিওনেল মেসি- যাঁর নাম ফুটবলের অভিধানে সৃজনশীলতার সমার্থক।
৮৫তম মিনিটে মেসির অসাধারণ দূরদর্শী পাস থেকে এনজো ফার্নান্দেজ দুর্দান্ত শটে জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করেন। স্কোরলাইন ১-১। গোলটি ছিল শুধু সমতা ফেরানোর নয়; এটি ছিল মানসিক লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা। ইংল্যান্ডের আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরে, আর আর্জেন্টিনা ফিরে পায় জয়ের বিশ্বাস।
এরপর অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে আবারও মেসির জাদু। নিখুঁত ক্রসে বদলি খেলোয়াড় লাউতারো মার্টিনেজ দুর্দান্ত হেডে বল জালে জড়িয়ে দেন। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় ইংল্যান্ড, উল্লাসে ফেটে পড়ে আর্জেন্টিনা। মাত্র সাত মিনিটে ১-০ থেকে ২-১ ফুটবল যেন আবারও প্রমাণ করল, নাটকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যটি অনেক সময় শেষ অঙ্কেই লেখা থাকে।
এই ম্যাচে লিওনেল মেসি গোল করেননি, কিন্তু দুই গোলেরই স্থপতি ছিলেন তিনি। একজন প্রকৃত নেতা কীভাবে ম্যাচের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে নিজের দলকে অনুপ্রাণিত করেন, কীভাবে একটি পাস, একটি সিদ্ধান্ত কিংবা একটি দৃষ্টিভঙ্গি পুরো ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারে- মেসি আবারও তার অনন্য উদাহরণ তুলে ধরলেন। বয়স বাড়লেও তাঁর ফুটবলীয় প্রজ্ঞা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা এখনও অতুলনীয়।
লিওনেল স্কালোনির কৌশলগত বিচক্ষণতাও সমানভাবে প্রশংসার দাবিদার। তিনি শেষ দিকে আক্রমণভাগে পরিবর্তন এনে ইংল্যান্ডের রক্ষণকে চাপে রাখেন। লাউতারো মার্টিনেজকে মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের কোচিং স্টাফের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল গোল করার পর অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক হয়ে যাওয়া। তারা মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং আর্জেন্টিনাকে বারবার আক্রমণের সুযোগ করে দেয়।
ফুটবল ইতিহাসে এমন অনেক নাটকীয় ম্যাচ রয়েছে, কিন্তু সব ম্যাচ ইতিহাস হয়ে ওঠে না। ইতিহাস হয়ে ওঠে সেই ম্যাচগুলো, যেগুলো মানুষের মনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। আটলান্টার এই সেমিফাইনাল নিঃসন্দেহে তেমনই একটি ম্যাচ।
এই জয় কেবল একটি ফাইনালে ওঠার গল্প নয়; এটি বিশ্বাস, ধৈর্য, নেতৃত্ব এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আর্জেন্টিনা আবারও দেখিয়ে দিল, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সবচেয়ে বড় শর্ত প্রতিভা নয়- শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা।
আর লিওনেল মেসি? তিনি যেন আরেকবার মনে করিয়ে দিলেন, ফুটবল শুধু পায়ের খেলা নয়; এটি দৃষ্টি, মেধা, সাহস, নেতৃত্ব এবং অদম্য বিশ্বাসের শিল্প। গোল না করেও একটি ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করা যায়, ইতিহাস লেখা যায়, কোটি মানুষের হৃদয়ে নতুন করে জায়গা করে নেওয়া যায়।
সম্ভবত এ কারণেই ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। কারণ এখানে শেষ বাঁশি বাজার আগে কোনো গল্প শেষ হয় না।
আটলান্টার সেই রাতও তাই কেবল একটি সেমিফাইনাল নয়; এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের এক অনন্য মহাকাব্য। আর সেই মহাকাব্যের শেষ পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে- আর্জেন্টিনা।
লেখক : কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।














