দেশজুড়ে যখন একের পর এক সড়ক, সেতু ও আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে উন্নয়নের ধারা এগিয়ে চলছে, তখনও মাত্র দুই কিলোমিটার সড়ক ও কয়েকটি সেতুর অভাবে উন্নয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে সীমান্তঘেঁষা ব্যাঙডেবা গ্রাম। প্রায় একশ পরিবারের বসবাসকারী কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের এই জনপদে আজও পৌঁছায়নি মৌলিক নাগরিক সুবিধা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ব্যাঙডেবা থেকে বাইশারী কিংবা ঈদগড়ে যেতে দুর্গম পাহাড়ি পথ, কাঁচা রাস্তা ও নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোই একমাত্র ভরসা। বর্ষা মৌসুমে পুরো গ্রাম কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শিক্ষা, চিকিৎসা, বাজার কিংবা প্রশাসনিক কাজে যেতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আবেদন, স্মারকলিপি এবং জনপ্রতিনিধিদের কাছে বারবার দাবি জানানো হলেও দুই কিলোমিটার সড়ক ও কয়েকটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে একের পর এক প্রজন্ম একই দুর্ভোগের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয় রোগীদের। অসুস্থ ব্যক্তিদের হাসপাতালে নিতে কয়েকজন মিলে কাঁধে করে দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয়। স্থানীয়দের দাবি, সময়মতো হাসপাতালে নিতে না পারায় গত কয়েক দশকে অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
শিক্ষার্থীরাও প্রতিদিন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। ব্যাঙডেবার শতাধিক শিক্ষার্থী বাইশারী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, বাইশারী শাহ নুরুদ্দীন দাখিল মাদ্রাসা, ঈদগড় এএমবি উচ্চ বিদ্যালয় এবং ঈদগড় বদর মোকাম জামেয়া ফেরদৌসিয়া আলীম মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে। প্রতিদিন তাদের প্রায় দুই কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি পথ হেঁটে বিদ্যালয়ে যেতে হয়।
যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে কৃষকরাও উৎপাদিত ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে নিতে পারেন না। ফলে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়ছেন তারা।
এ ছাড়া গ্রামটিতে এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। মোবাইল নেটওয়ার্কও অত্যন্ত দুর্বল। ফলে ডিজিটাল যুগেও তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন শিক্ষার্থী ও তরুণরা।
বাইশারী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী আবুল কালাম বলেন, ‘জন্মের পর থেকে দেখে আসছি আমাদের গ্রামে উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া নেই। রাস্তা নেই, বিদ্যুৎ নেই, মোবাইল নেটওয়ার্কও ঠিকমতো পাওয়া যায় না। প্রতিদিন কষ্ট করে স্কুলে যাতায়াত করতে হয়।’
ঈদগড় এএমবি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ হাকিম বলেন, ‘রামুর অন্যান্য এলাকায় উন্নয়ন হলেও ব্যাঙডেবা এখনো পিছিয়ে আছে। আমাদের গ্রামের মানুষ মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’
স্থানীয় বাসিন্দা মো. শাহ আলম, মো. সেলিম উল্লাহ, মো. শামসুল আলম, মো. নুরুল আলম ও মো. জলিল বলেন, ‘আমাদের দাবি খুবই সামান্য। মাত্র দুই কিলোমিটার রাস্তা ও কয়েকটি সেতু নির্মাণ করা হলে শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ সবার দুর্ভোগ কমে যাবে এবং পুরো গ্রামের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আসবে।’
জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য একরামুল হক বাবুল বলেন, ‘ব্যাঙডেবা আমার ওয়ার্ডের সবচেয়ে অবহেলিত এলাকা। প্রায় একশ বছর ধরে মানুষের বসবাস হলেও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি। বন বিভাগের কিছু জটিলতা রয়েছে। তবে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হলে সমস্যার সমাধান সম্ভব।’
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতির অবসান ঘটিয়ে দ্রুত সড়ক ও সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাহলেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে এবং উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত হবে দীর্ঘদিনের অবহেলিত ব্যাঙডেবা গ্রাম।














