‘ডিম ভেজে রেখো, আমি দোকান থেকে এসে ভাত খাব’— স্ত্রীকে এ কথাই বলেছিলেন স্বপন বড়ুয়া। হাতে একটি টর্চলাইট ও ছাতা নিয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আর ফেরা হয়নি। সারারাত খোঁজাখুঁজির পর বুধবার দুপুরে তার কর্মস্থল গৌরচন্দ্র-যতীন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশের একটি বিল থেকে উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ।
নিহত স্বপন বড়ুয়া (৫৬) রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ুয়া পাড়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে গৌরচন্দ্র-যতীন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী ও নৈশপ্রহরী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই বিবাহিত মেয়েকে নিয়ে ছিল তার সংসার।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার বিকেলে বাজার করে বাড়ি ফেরেন স্বপন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে স্ত্রীকে ডিমভাজি প্রস্তুত রাখতে বলে তিনি বাইরে বের হন। পা ধোয়ার জন্য পানিও রেখে যান। কিন্তু রাত গভীর হলেও তিনি আর ফিরে আসেননি।
নিহতের বড় মেয়ে দোলা বড়ুয়া বলেন, ‘বাবা বলেছিলেন দোকান থেকে এসে ভাত খাবেন। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি দোকানেই যাননি। সারারাত আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা তাকে খুঁজেছেন।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অশোতোষ বড়ুয়া জানান, বুধবার বেলা ১২টার দিকে বিদ্যালয়ের পাশের বিলে ধান কুড়াতে গিয়ে স্থানীয় কৃষক কাঞ্চন বড়ুয়া মরদেহটি দেখতে পান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়।
প্রতিবেশী প্রসেনজিৎ বড়ুয়া বলেন, ‘রাত ৩টা পর্যন্ত আমরা খোঁজ করেছি। সকালে জিডি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এর মধ্যেই মরদেহ উদ্ধারের খবর পাই।’ তিনি জানান, মরদেহের পাশে একটি টর্চলাইট, ছাতা এবং দুটি বিষের বোতল পাওয়া গেছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারীদের কেউ কেউ মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। স্থানীয় বিহারের অধ্যক্ষ শ্মশান রক্ষিত ভিক্ষু দাবি করেন, মরদেহের মুখে ফেনা দেখা গেলেও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তার মতে, বিষয়টি গভীর তদন্তের দাবি রাখে।
তিনি আরও জানান, একটি ব্যাংক ঋণের জামিনদার হওয়ায় স্বপন কিছুদিন ধরে মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন বলে জানা গেছে। তবে মৃত্যুর সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা তদন্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয়।
স্থানীয়দের একাংশের ধারণা, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডও হতে পারে। যদিও এসব দাবির সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, ২০০০ সাল থেকে বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন স্বপন বড়ুয়া। চাকরির আরও প্রায় তিন বছর বাকি ছিল। বুধবার ব্যাংকে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে আগের দিন ছুটির আবেদনও করেছিলেন তিনি।
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে এটি অপমৃত্যু বলে মনে হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।’
এদিকে, গত পাঁচ দিনের ব্যবধানে রাউজানে একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড এবং দুটি রহস্যজনক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বেড়েছে। গত ১৩ জুন পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারে গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে। এর তিন দিন পর উরকিরচর এলাকায় উদ্ধার করা হয় মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক মো. রাশেদের মরদেহ।
পরপর এসব ঘটনায় এলাকায় নানা আলোচনা ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।














