২১ অক্টোবর ২০২৬

২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: প্রার্থী কতজন, ভোট হবে কীভাবে

সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০ আগস্ট দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এটি হবে দ্বিতীয় আয়োজন। এর আগে ১৯৯১ সালে একবার রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হয়েছিল।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিকেল ৪টা। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি পদে এ পর্যন্ত তিনটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি সংগ্রহ করেছে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং একটি সংগ্রহ করেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।

তিনটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ হলেও শেষ পর্যন্ত প্রার্থী হচ্ছেন দুজন— এমন সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, একই প্রার্থীর নামে একাধিক মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে বিএনপির পক্ষ থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হলেও একজনকেই প্রার্থী করার কথা রয়েছে।

বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল?
বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি পদে দলটির প্রার্থী হিসেবে মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। দলীয় সূত্রের দাবি, শেষ পর্যন্ত তার নামই চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

আগামীকাল প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাষ্ট্রপতি পদে দলের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করতে পারেন বলে বিএনপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিশ্চিত নয়।

ইসি সূত্র জানিয়েছে, একই ব্যক্তির নামে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একটি মনোনয়নপত্রে কোনো ধরনের ভুলত্রুটি থাকলে বিকল্প মনোনয়নপত্রটি বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ রাখতেই এমন ব্যবস্থা। সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নির্বাচনের সময়ও একইভাবে একাধিক মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছিল।

১১ দলীয় জোটের প্রার্থী অলি আহমদ
অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট রাষ্ট্রপতি পদে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।

গত রোববার জোটের বৈঠক শেষে অলি আহমদের নাম ঘোষণা করা হয়। পরদিন সোমবার জোটের পক্ষে নির্বাচন কমিশন থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।

ফলে বিএনপির প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা দুই প্রার্থীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

একজন প্রার্থী হলে ভোট হবে না
রাষ্ট্রপতি পদে একমাত্র প্রার্থী থাকলে এবং যাচাই-বাছাইয়ে তার মনোনয়নপত্র বৈধ বিবেচিত হলে ভোটের প্রয়োজন হবে না। নির্বাচন কমিশন তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করবে।

তবে একাধিক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ হলে কমিশন তাদের নাম ঘোষণা করবে এবং নির্ধারিত দিনে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।

এ জন্য জাতীয় সংসদের একটি বিশেষ অধিবেশন ডাকার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সরকারি দলের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকা হবে। অধিবেশনটি স্বল্পমেয়াদি হওয়ার কথা রয়েছে।

১৯৯১ সালে হয়েছিল প্রথম ভোট
সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর ১৯৯১ সালে প্রথমবার রাষ্ট্রপতি পদে সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোট অনুষ্ঠিত হয়। ওই বছরের ৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী।

সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যসহ মোট ৩৩০ জন ভোটার থাকলেও সেদিন ভোট দেন ২৬৪ জন। ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন ৬৬ জন সংসদ সদস্য।

ফলাফলে আবদুর রহমান বিশ্বাস পান ১৭২ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট। ফলে আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

এরপর গত ৩৫ বছরে আটবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও প্রতিবারই একক প্রার্থী থাকায় ভোটের প্রয়োজন হয়নি।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল
আগামী ২০ আগস্ট ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন।

তফসিল অনুযায়ী—

* মনোনয়নপত্র দাখিল: ১৩ আগস্ট, সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা
* মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই: ১৬ আগস্ট
* প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন: ১৮ আগস্ট
* ভোটগ্রহণ: ২০ আগস্ট
* ভোটের সময়: দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা
* ভোটের স্থান: জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষ

একজন প্রার্থী একাধিক মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন। যাচাই-বাছাইয়ের পর বৈধ মনোনয়নপত্রের ভিত্তিতে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে।

যেভাবে ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা
২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে বিরতিহীনভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে। ভোটের কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থাও থাকবে।

ইসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভোটার অর্থাৎ সংসদ সদস্যরা অধিবেশন কক্ষের নিজ নিজ আসনে অবস্থান করবেন। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তাদের কাছে ব্যালট পেপার পৌঁছে দেবেন।

প্রতিটি ব্যালট পেপারে দুটি অংশ থাকবে—মুড়ি অংশ ও মূল ব্যালট। মুড়ি অংশে থাকবে প্রার্থীর ক্রমিক নম্বর, ভোটারের নাম, বিভক্তি নম্বর এবং স্বাক্ষরের ঘর।

মূল ব্যালটে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম থাকবে। পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত স্থানে ভোটারকে প্রার্থীর পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হবে।

সংসদ সদস্যদের ভোট প্রদানের সুবিধার্থে অধিবেশন কক্ষে তিনটি স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স রাখা হবে। ভোটাররা যেকোনো একটি ব্যালট বাক্সে তাদের ব্যালট পেপার জমা দিতে পারবেন।

ভোট শেষে অধিবেশন কক্ষেই গণনা
বিকেল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর অধিবেশন কক্ষের ভেতরেই ব্যালট বাক্স খুলে ভোট গণনা শুরু হবে। ইসির নির্ধারিত চার বা পাঁচ সদস্যের একটি ব্যালট গণনা দল প্রথমে ব্যালট পেপার বাছাই করবে। এরপর বৈধ ও বাতিল ভোট আলাদা করে গণনা করা হবে।

মোট ৩৪৯টি ব্যালটের মধ্যে কতটি বৈধ, কতটি বাতিল এবং কোন প্রার্থী কত ভোট পেয়েছেন— তা প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি), নির্বাচনকর্তা হিসেবে, অধিবেশন কক্ষেই প্রকাশ্যে ঘোষণা করবেন। পরে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে গিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফলের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা হবে।

সবকিছু নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী ২০ আগস্টই স্পষ্ট হবে—বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, আর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচনের প্রয়োজন হচ্ছে কি না।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ