৬ নভেম্বর ২০২৬

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে টিউশন দিতে প্রতারণা

মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক»

ছাত্রজীবনে স্বচ্ছল থাকতে হলে একটু পরিশ্রমী হতে হয়। তবে এ পরিশ্রম নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধিকে বিসর্জন দিয়ে নয়। ছাত্রজীবনে আয়ের অন্যতম অবলম্বন টিউশন। টিউশন থেকে যে আয় হয় তা দিয়ে নিজের পড়ালেখার খরচ নিবারণ করা কোন ব্যাপারই নয়। যারা নিম্নবিত্ত অথবা মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থী তাদের অন্যতম আয়ের উৎস এই টিউশন। একসময় টিউশন কারার জন্য আশে পাশে লোকজনকে বা প্রতিবেশী পরিবারগুলোকে একটু বলে রাখলেই টিউশন পাওয়া যেত। তবে এক্ষেত্রে নিজেকে নম্র, ভদ্র ও পড়ালেখার মাণের উপর নির্ভরশীলতা ছিল। এতে টিউশন পেতে বেগ পেতে হতো না।

অভিযোগ রয়েছে, ডিজিটাল এ যুগে টিউশন পেতে অনেকের কাছে ধর্ণ্যা দিতে হয় না। ফেসবুক এর মাধ্যমে অন্যতম পথ বেরিয়ে আসে। তবে ফেসবুকে ভালো-খারাপ দুটোই রয়েছে। কিন্তু জ্ঞান বুদ্ধি খরচ করে একটু বাজিয়ে নিতে হয়। ফেসবুকের পোস্ট দেখে লাইক শেয়ার না করে কে বা কারা টিউশন দিচ্ছে তাদের সম্পর্কে একটু জেনে না নিলে যে কোন সময় বিপদের সম্মুখীন হতে হয়। যে পোস্ট মডারেটরের অত্যধিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সেক্ষেত্রে টিউটরের উচিত এমন পোস্ট পরিহার করা। কারণ টিউশন হচ্ছে শিক্ষার বিনিময়ে আয়ের পথ। জ্ঞান বুদ্ধি লোপ পাওয়া শিক্ষার্থীর জন্য টিউশন নয়।

আরো অভিযোগ রয়েছে, ফেসবুকে চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে অনেকেই লোভে পড়ে যাচ্ছে। নিজের মেধা দিয়ে বিবেচনা না করেই প্রতারকের কথায় সায় দিয়ে যখন বিপদে পরে তখনই আইনের আশ্রয় নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী এমন লোভনীয় টিউশন বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ছে। টিউশন মিডিয়ার নামে এ ধরনের প্রতারণা বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। প্রতারক চক্র ৫০ শতাংশ কমিশনের শর্তে বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে স্ট্যাটাস শেয়ার করে বিভিন্ন আইডি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রুপে লোভনীয় টিউশনি দিয়ে আসছে। যারা এই ধরনের ফাঁদে পড়ছে তাদের বেশিরভাগই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, সিএমসিএইচ এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন নামিদামী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের খরচ চালানোর জন্য এ ধরনের লোভে আগ্রহী হয়। এ ধরনের প্রতারণামূলক টিউশন মিডিয়ার সাথে যোগাযোগ করে কষ্টার্জিত সঞ্চিত টাকা হারাতে হচ্ছে।

র‌্যাব সেভেন সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ এপ্রিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোঃ রিদুওয়ানুল হক র‌্যাব-৭ দফতরে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে মোঃ মাইনুদ্দিন হাসান (২৫) ফেইক নেইম ব্যবহার করে ‘মাহতির ইসলাম’ নামক ফেসবুক আইডি খুলেছে এক প্রতারক। টিউশন দেয়ার নামে প্রতারণামূলক বিভিন্ন পোস্ট দিচ্ছে এই পেইজে। টিউশন দেওয়ার নামে মিডিয়া ফি বাবদ প্রথম মাসের বেতনের ৫০% টাকা অগ্রীম দিলেই টিউশন মিলবে এমন চটকদার তথ্যও দেওয়া হয়েছে। এমন শর্তে রাজি থাকলেই হোয়াটস অ্যাপে এসএমএস দিতে বলা হয়েছে আগ্রহীকে। রিদুয়ানুল উক্ত হোয়াটসঅ্যাপ নাম¦ারে নক দিয়ে টিউশন করতে আগ্রহ প্রকাশ করে। তখন টিউশন মিডিয়ার মডারেটর মাইনুদ্দিন রিদোয়ানুলকে পূর্ণ নাম ঠিকানা দিতে বলে। এমনকি তার অফিসে গিয়ে টিউশনের অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে অগ্রীম মিডিয়া ফি দিয়ে যেতে বলে অথবা বিকাশে পাঠাতে বলে। রিদোয়ানুল তখন মাইনুদ্দিনের দেওয়া বিকাশ নাম¦ারে ২ হাজার ৫০০ টাকা বিকাশ করে। এরপর টিউশনের অভিভাবকের মোবাইল নম¦র ও ঠিকানা চাওয়া হলে মাইনুদ্দিন একটি মোবাইল নম¦র দেয় রিদোয়ানুলকে। ওই ক্ষুদে বার্তায় রিদোয়ানুলকে ৮ এপ্রিলের পর অভিভাবককে ফোন করতে বলে।

রিদোয়ান র‌্যাব সেভেনকে আরো জানিয়েছে, গত ৮ এপ্রিল অভিভাবকের মোবাইল নম¦রে ফোন করলে নাম¦ারটি বন্ধ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে জানতে মাইনুদ্দিনের নাম¦ারে একাধিকবার ফোন করা হলেও রিদোয়ানের কল রিসিভ করেনি সে । এক পর্যায়ে মাইনুদ্দিন রিদোয়ানের মোবাইল নম¦র ব্লকলিস্টে ঢুকে ব্লক করে দেয়। এতে ভিকটিম নিশ্চিত হয় যে মাইনুদ্দিন নিম্নবিত্তের সরলতার সুযোগ নিয়ে প্রতারণামূলক ২ হাজার ৫শ’ টাকা আত্মসাৎ করেছে। অবশেষে কোনভাবেই মাইনুদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে আইনের আশ্রয় নিতে র‌্যাব সেভেনের দফতরে যায় রিদোয়ান।

ভিকটিমের অভিযোগের প্রেক্ষিতে র‌্যাব-৭ আসামীকে গ্রেফতারের জন্য গোয়েন্দা নজরদারী এবং ছায়াতদন্ত শুরু করে। নজরদারীর একপর্যায়ে র‌্যাব-৭, চট্টগ্রাম জানতে পারে যে, উক্ত আসামী চট্টগ্রাম মহানগরীর পাচঁলাইশ থানাধীন কসমোপলিটন আবাসিক এলাকায় অবস্থান করছে। উক্ত তথ্যের ভিত্তিতে গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬টার সময় মোঃ মাইনুদ্দিন হাসান (২৫) কে আটক করে। সে সাতকানিয়ার গারংগিয়া ইউনিয়নের মুকতার আহমেদের ছেলে।

র‌্যাব সেভেনের তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদে সে মনের অকপটে স¦ীকার করেছে ‘মাহতির ইসলাম’ নামক ফেইক ফেসবুক আইডি আছে। টিউশন দেয়ার বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে ভিকটিমের সরলতার সুযোগ নিয়ে প্রতারণা করেছে। এমনকি ভিকটিমের টাকা আত্মসাৎ করেছে। এছাড়াও সে টিউশন পেজের মাধ্যমে বিভিন্ন মানুষের নিকট হতে প্রতারণার মাধ্যমে টিউশন মিডিয়া ফি বাবদ বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ইতিপূর্বে বিভিন্ন তারিখ ও সময়ে ম্যাসেঞ্জারে ভিকটিমের সাথে কথোপকথনের স্ক্রীন শর্টের ২৫ কপি আলামত হিসেবে জব্দ করা হয় মাইনুদ্দিনের মোবাইল থেকে। তাকে থানায় সোপর্দের মধ্যদিয়ে আদালত তাকে জের হাজতে প্রেরণ করেছে।

আরও পড়ুন