১৭ মার্চ ২০২৬

স্মৃতিতে অম্লান সাবেক ক্রিকেটার মানজারুল রানা

ঐতিহ্যবাহী দামাল-সামার ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ঐতিহাসিক আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে আমার আইকন বাংলাদেশের লিজেন্ডারি ক্রিকেটার বীর চট্টলার কৃতি সন্তান, প্রিয় দল আবাহনীর সাবেক প্রাণভোমরা আকরাম খান এবং সে সময় আবাহনীর হয়ে খেলা ইংল্যান্ড জাতীয় দলের সাবেক বিখ্যাত খেলোয়াড় নেইল ফেয়ারব্রাদারের অসাধারণ ইনিংস দেখে ক্রিকেটপ্রেমে বুঁদ হয়ে ছিলাম। তখন থেকেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের নাড়ি-নক্ষত্র নখদর্পণে রাখার চেষ্টা করেছি বরাবরে। প্রিয় দল আবাহনী এবং আমাদের গর্ব বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের একজন অন্ধ সমর্থক হিসেবেই হোক কিংবা ভাগ্যগুণেই হোক, কিংবা ক্রীড়াপ্রেমী হিসেবেই হোক—বিশ্বখ্যাত ক্রিকেটারদের সান্নিধ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অনেক প্রথিতযশা ও স্বনামধন্য ক্রিকেট খেলোয়াড়দের সান্নিধ্যে আসার বেশ ভালোই সুযোগ হয়েছে আমার। অনেকের সাথে আবার গড়ে উঠেছে পারিবারিক সম্পর্ক।

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলে ডাক পেয়ে নিজ পারফরম্যান্সের গুণে খুবই অল্প সময়ে যেসব ক্রিকেটার জনমানসে ঠাঁই করে নিয়েছেন, তাদের মধ্যে মানজারুল ইসলাম রানা অন্যতম। সদা স্মিত হাসি এবং মৃদুভাষী এই ক্রিকেটারের সাথে আমার বিশেষ সখ্যতা না থাকলেও অল্প সময়ের কথোপকথনেই আমার হৃদয় জিতে নিয়েছিলেন—যেভাবে উইকেট শিকার করে কিংবা ব্যাট হাতে ঝড়ো গতিতে রান করে হৃদয় জিতে নিয়েছিলেন আমজনতার।

২০০৪ সালের ডিসেম্বর মাসে (বাংলাদেশ-ভারত) সিরিজে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে প্রথমবারের মতো ভারতকে হারিয়ে তৃতীয় ওয়ানডে খেলতে বীর চট্টগ্রামের মাটিতে পা রেখেছিল বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল, ঘাঁটি গেড়েছিল হোটেল আগ্রাবাদে। হোটেলের সুইমিং পুলের একজন নগণ্য সদস্য হিসেবে খুবই কাছ থেকে ভারত-বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের পরখ করেছিলাম। এখনকার মতো সে সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থার যথেষ্ট বাড়াবাড়ি না থাকলেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও উভয় দলের ক্রিকেটারদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে এক ধরনের নির্লিপ্ত ভাব ছিল।

ভারতের লিজেন্ডারি অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি, যুবরাজ ও হরভজন সিংয়ের সাথে প্রায় মিনিট দশেকের মতো কথা হয়েছিল সেসময়। চট্টগ্রামের ম্যাচের আগের দিন জুমাবার ছিল। তখনো জুমার নামাজের ঘণ্টাখানেক বাকি। সুইমিং শেষে ফ্রেশ হয়ে হোটেল আগ্রাবাদের গেটের বাইরে আসতেই চোখে পড়ল রাজিন সালেহ এবং মানজারুল ইসলাম রানাকে—জায়নামাজ হাতে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। আমার সাথে আই কন্টাক্ট হতেই হাত বাড়িয়ে দিলাম। খুব সহজেই দুজনেই সানন্দে তা গ্রহণ করলেন এবং ঢাকায় ভারতের বিপক্ষে ঐতিহাসিক বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে চলে আসার সময় মানজারুল রানা জিজ্ঞেস করলেন, “আগামীকালের ম্যাচ দেখতে যাব কিনা?”

আমি বললাম, “অবশ্যই।”

পাক্কা ১০ মিনিট ওই জায়গায় দাঁড়িয়ে কথা বলেছিলেন নিরহংকারী এই ক্রিকেটার। চলে আসার সময় জড়িয়ে ধরেছিলেন। ক্রিকেটীয় পারফরম্যান্স এবং সেই দিনের অমায়িক ব্যবহারের কারণে আমার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন মানজারুল ইসলাম রানা। সেই থেকে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের স্কোয়াড ঘোষণা হলেই আগে দেখতাম মানজারুল ইসলাম রানার নাম আছে কিনা। কিংবা বল বা ব্যাট হাতে নামলে মানজারুল রানার সফলতা কামনা করতাম কায়মনোবাক্যে। পরবর্তীতে ইনজুরির কারণে ২০০৭ সালের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ঠাঁই হয়নি মানজারুলের।

২০০৭ সালের এই দিনে অর্থাৎ ১৬ই মার্চ (তারপরের দিন ১৭ই মার্চ বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক ম্যাচ) সন্ধ্যায় টিভি মারফত জানতে পারলাম খুলনায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন মানজারুল রানা এবং আরেক প্রতিশ্রুতিশীল ক্রিকেটার সেতু। মুহূর্তের মধ্যে ভেসে উঠল মানজারুল রানার সেই চিরচেনা স্মিত হাসি এবং সেই কথোপকথনের মুহূর্ত। নিঃশব্দে চোখের কোণে নোনা জল ভেসে উঠেছিল। সে সময় বিশ্বকাপ খেলতে দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থানরত রানার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বাংলাদেশের লিজেন্ডারি ক্রিকেটার মাশরাফি ঘোষণা দিলেন

“রানার জন্য খেলবে বাংলাদেশ।”

সত্যিই পরের দিন ভারতের বিপক্ষে মানজারুল রানার জন্যই খেলেছিল পুরো বাংলাদেশ দল। রানাকে হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে ভারতকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে বাংলাদেশের লাখো-কোটি জনগণকে মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে রাজপথে নেমে বিজয় উল্লাসের সুযোগ করে দিয়েছিল বীর বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। সেদিন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রতিটি সদস্য এবং বাংলাদেশের জনগণের সাথে অশরীরী উপস্থিতি ছিল মানজারুল রানার।

সদা স্মিত হাস্যবদন, বিনয়ী ও নিরহংকারী মানজারুল ইসলাম রানার ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি—তিনি যেন রানা ভাইকে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান দান করেন।

লেখক: তানভীর আহমেদ
(গণমাধ্যম কর্মী)

আরও পড়ুন