চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১৭ সাল থেকে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। একইসাথে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কার্যাদেশ দিয়ে কর্পোরেশনের আওতাধীন খালগুলো থেকে বর্জ্য-মাটি অপসারণের কাজ পরিচালনা করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। অভিযোগ উঠেছে, খালগুলো থেকে কাগজে কলমে বর্জ্য-মাটি উত্তোলন দেখানো হলেও বাস্তবে উত্তোলন করা হয়েছে কোটি কোটি টাকার বিল।
চসিকের নামে চলমান প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, খাল খনন ও বর্জ্য অপসারণের কাজ বাস্তবে না করেই কোটি কোটি টাকার বিল উত্তোলন করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)-এর পরিচ্ছন্নতা বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন খাল ঘুরে দেখা গেছে, কাগজে-কলমে কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে অধিকাংশ খালের কোথাও উল্লেখযোগ্য খনন বা বর্জ্য অপসারণের চিহ্ন নেই। অথচ এসব কাজের বিপরীতে ইতোমধ্যে কোটি টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। ফলে প্রতি বছরের মতো আসন্ন বর্ষা মৌসুমেও জলাবদ্ধতার দুর্ভোগে পড়তে যাচ্ছে প্রায় ৭০ লাখ নগরবাসী।

এই প্রেক্ষাপটে চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের নেতৃত্ব ঘিরে পূর্বের গুরুতর অভিযোগগুলো নতুন করে সামনে আসছে। চসিকের প্রাক্তন প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা কমান্ডার লতিফুল হক কাজমীর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে ওঠা ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের সঙ্গেই বর্তমান পরিস্থিতির সরাসরি যোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। সুজন চট্টগ্রামের এক সদস্যের দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়েছিল, তিনি সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন করে টেন্ডার ও ইজিপি প্রক্রিয়ায় শতাধিক ফাইলে অনিয়ম করে ১০ কোটির বেশি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। ভুয়া কাজ দেখিয়ে বিল উত্তোলন, নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা বেনামী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ বণ্টন, অতিমূল্যে সরঞ্জাম ক্রয় এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজ পাইয়ে দেওয়ার মতো অভিযোগও উঠে আসে। এমনকি সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া, অনিয়মে সই না করায় কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া এবং তদন্ত ছাড়াই অভিযুক্তদের অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনাও আলোচিত হয়। অভিযোগে আরও উল্লেখ ছিল, সরকারি ক্রয়-বিধির (পিপিআর) ৭৬ (ট) ধারা অপব্যবহার করে শতাধিক ফাইলে নয়ছয় করা হয় এবং অন্তত ৩৮টি ফাইলে ভুয়া কাজ দেখিয়ে ২ কোটির বেশি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। সেই ২০২৪ সালের অভিযোগের পর দুই বছর পেরিয়ে ২০২৬ সালে এসেও নগরীর খালগুলোর বাস্তব চিত্রে দৃশ্যমান উন্নতি না থাকায় প্রশ্ন উঠছে- তখনকার অনিয়মই কি আজকের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সংকটকে আরও গভীর করেছে?
এদিকে আজ ৩০ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) চট্টগ্রামের সকল খাল ও নালা নিষ্কাষণ সচল রাখাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন ও সেবামূলক কাজের সমন্বয় এর জন্য একটি ১৯ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এই কমিটির আহবায়ক করা হয়েছে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনকে।
প্রকল্পে হাজার কোটি টাকা, বাস্তবে নেই কাজের অগ্রগতি
চট্টগ্রাম নগরীতে মোট খালের সংখ্যা ৫৭টি হলেও জলাবদ্ধতা নিরসনের বড় প্রকল্পগুলোতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে মাত্র ৩৬টি খাল। বাকি ২১টি খাল সংস্কারের বাইরে রেখেই তিন সংস্থা চারটি বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করে, যার মোট ব্যয় প্রায় ১৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এছাড়া ওই ২১টি খাল পরিষ্কারের জন্য সরকার পৃথকভাবে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। অভিযোগ উঠেছে, এই বরাদ্দের বিপরীতে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে পুরো অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
কর্নেলহাটে ‘কাগুজে খনন’, বাস্তবে ময়লার স্তূপ
নগরীর কর্নেলহাটের সরোজিনী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রাইসা কনস্ট্রাকশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান শায়েরপাড়া খাল, ছড়ার খাল ও নাজির খালের কাজ পায়। এই তিন খালের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ১২ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন- খালের বিভিন্ন স্থানে পলিথিন, আবর্জনা ও পলিতে ভরাট হয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত। কোথাও বড় ধরনের খননের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দা মহিউদ্দিন বলেন, “কয়েকদিন কিছু শ্রমিক এসে সামান্য ময়লা তুলে চলে গেছে। এরপর আর কোনো কাজ হয়নি। কিন্তু শুনছি বিল তুলে নেওয়া হয়েছে।”
বাকলিয়ায় একই চিত্র: ছবি তুলে ‘কাজ শেষ’
নগরীর বাকলিয়া এলাকায় রসুলবাগ খাল, গুলজার খান খাল ও বড়পোল এলাকার খালের কাজ পায় শিরোপা ট্রেডার্স। এসব খালের জন্য বরাদ্দ ছিল প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। সরেজমিনে দেখা যায়, খালগুলো আগের মতোই ময়লা ও পলিতে ভরাট- খননের কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, ছবি তুলে কাগজে কাজ শেষ দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে শিরোপা ট্রেডার্সের মুজিব বলেন, “এই টেন্ডার গত বছরের, এবছর টেন্ডার নেই। টেন্ডারের মেয়াদ থাকাকালীন আমরা কাজ করেছি।”
চসিকের ২৩ খাল প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নিজ উদ্যোগে ২৩টি খাল পরিষ্কারের দায়িত্ব নেয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব খালের অনেকগুলোতেই বাস্তবে কোনো কাজ না করেই ১০ কোটি টাকার বেশি বিল উত্তোলন করা হয়েছে। নিয়মিত খনন না হওয়ায় খালগুলো পলিথিন, আবর্জনা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে ভরাট হয়ে আছে, যা বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও চলছে অনিয়ম
খাল খননের পাশাপাশি নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বাসা-বাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের জন্য ২০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে, যা ঘোষণার পরও বন্ধ হয়নি। কিছু এলাকায় মাসে ২-৩ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
প্রাণহানির পরও নেই জবাবদিহি
গত ১০ বছরে খাল-নালায় পড়ে অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘটনায় কার্যকর তদন্ত বা দায় নির্ধারণ হয়নি। হাইকোর্ট ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশে তদন্ত হলেও কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আবার আজকে চট্টগ্রামের সকল খাল ও নালা নিষ্কাষণ সচল রাখাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন ও সেবামূলক কাজের সমন্বয় এর জন্য একটি ১৯ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এই কমিটির আহবায়ক করা হয়েছে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনকে।
সরকারি পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে অনিয়মের ইঙ্গিত
২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি খাল খনন কার্যক্রম পরিদর্শনে এসে উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান স্বীকার করেন, অতীতে খাল খননের নামে অনিয়ম ও অর্থ লুটপাট হয়েছে। মেয়র শাহাদাত হোসেন সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করে পরিস্থিতির উন্নতির আশ্বাস দিলেও ২০২৬ সালে এসে বাস্তব চিত্রে তার প্রতিফলন মিলছে না।
হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, তবুও জলাবদ্ধতা অপরিবর্তিত
বর্তমানে চট্টগ্রামে তিন সংস্থা চারটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যার মোট ব্যয় প্রায় ১৪ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা। ৮ থেকে ৯ বছর ধরে প্রকল্পগুলো চলমান থাকলেও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হয়নি।
কর্তৃপক্ষের নীরবতা
এ ব্যাপারে চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীকে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
পরিচ্ছন্নতা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাসির উদ্দীন রিফাতের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, গত বছর তারা পরিষ্কারের কাজ করেছে। আমাদের কাছে সেসব কিছুর ছবি আছে।

কিন্তু যখনই প্রশ্ন করা হয়, পরিষ্কারের কাজ ছবিতে করা হলেও বাস্তবে কোন প্রতিফলন নেই কেন? সে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমার কাছে পরিষ্কার করার ছবি ও প্রমাণ সকল কিছুই রয়েছে এবং যদি আপনাদের কাছে উপযুক্ত প্রমাণ থেকে থাকে তাহলে আপনি নিউজ করেন।”
নগরবাসীর প্রশ্ন: টাকা গেল কোথায়?
খাল খনন ও বর্জ্য অপসারণ বাস্তবে না হলে কোটি কোটি টাকার বিল কীভাবে উত্তোলন হলো- এই প্রশ্ন এখন নগরজুড়ে। নগরবাসীর দাবি, দুর্নীতি ও অনিয়মের লাগাম টানা না গেলে হাজার কোটি টাকার প্রকল্পও কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগই ভোগ করতে হবে।
আরও পড়ুন: চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তার অপরিচ্ছন্ন যতো কাজ!












