বছরের পর বছর জলাবদ্ধতার অভিশাপে নাকাল চট্টগ্রামবাসীর জন্য এলো স্বস্তির খবর। ভয়াবহ জলাবদ্ধতার পর এবার নড়েচড়ে বসেছে সরকার। চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন করে ১৪০ কোটি টাকা ছাড় দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ অর্থ ছাড়ের ফলে দীর্ঘদিন ধরে ধীরগতিতে চলা প্রকল্পের কাজে নতুন গতি আসবে এবং আগামী বর্ষার আগেই অধিকাংশ কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রকল্প পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মাঈনুদ্দিন জানান, চলতি অর্থবছরে সরকার এ পর্যন্ত ৫৮২ কোটি টাকা ছাড় দিয়েছে। আগামী জুনের আগে আরও ১৭০ কোটি টাকা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এসব অর্থ পাওয়া গেলে জলাবদ্ধতা নিরসনের মেগা প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। চলতি বর্ষার আগে বড় ধরনের কাজ করা সম্ভব না হলেও আগামী বর্ষার আগেই পুরো প্রকল্প শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
গত ২৮ ও ২৯ এপ্রিলের টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম মহানগর ভয়াবহ জলাবদ্ধতার শিকার হয়। নগরীর বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়ে মানুষ। বিষয়টি জাতীয় সংসদেও আলোচিত হয়। পরে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা আসে।
জলাবদ্ধতার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে গঠন করা হয় ১৯ সদস্যের একটি মনিটরিং কমিটি। এরপরই দ্রুততার সঙ্গে ১৪০ কোটি টাকা ছাড়ের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়।
জলাবদ্ধতাবিষয়ক মনিটরিং কমিটির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ইতোমধ্যে খালে বাঁধ দিয়ে সব ধরনের উন্নয়নকাজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে নগরীর বিভিন্ন খালে দেওয়া প্রায় অর্ধশত বাঁধ কেটে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী আহমেদ মাঈনুদ্দিন জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। চলতি অর্থবছরে সরকারের কাছ থেকে ৯৬০ কোটি ৮২ লাখ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছিল মাত্র ৪৪২ কোটি টাকা।। ফলে ঠিকাদারদের বকেয়া রেখেই প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যেতে হয়েছে। নতুন বরাদ্দের টাকা দিয়ে বকেয়া পরিশোধের পাশাপাশি চলমান কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল মোহাম্মদ মহসিনুল হক বলেন, ‘বৈশাখের বৃষ্টিতে সৃষ্ট দুর্ভোগের পর হিজরা খাল, জামালখান খাল ও রামপুর খালে কোনো কাজ করতে নিষেধ করা হলেও প্রকল্পের আওতায় আরও অনেক কাজ রয়েছে। খালের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রেখে আমরা সেই কাজগুলো অব্যাহত রাখব।’
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, প্রকল্পের আওতায় নগরীর ৩৬টি খালের উন্নয়নকাজ চলছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৯৪ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এখনো বিভিন্ন খালের রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, পুনঃখনন ও খালের পাশের রাস্তা নির্মাণের কাজ বাকি রয়েছে।
চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন জানান, বিশেষ বরাদ্দের অর্থ দিয়ে নগরীর ৩৫টি খাল ও ৬০০ নালা থেকে মাটি উত্তোলনের কাজ করা হবে। পাশাপাশি পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত কার্যক্রম নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর মেগা প্রকল্পটি ২০১৭ সালে একনেকে অনুমোদন পায়। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। পরে ২০২৩ সালে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ৮ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা করা হয়। এ ছাড়া বহদ্দারহাট থেকে বারৈয়পাড়া পর্যন্ত নতুন খাল খনন, সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পৃথক প্রকল্পসহ বর্তমানে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসনে মোট ১৪ হাজার ২৮০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষ হলে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবে চট্টগ্রাম মহানগর।














